প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃষিকাজে আগাছা দমনে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক প্যারাকোয়াট বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর একটি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও ২০২৪ সালে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২-তে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কৃষিক্ষেত্রে সহজলভ্যতা এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবের কারণে প্যারাকোয়াট শুধু কৃষক বা কৃষিশ্রমিকদের জন্য নয়, গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে আত্মহত্যার উপকরণ হিসেবে এর ব্যবহার বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা ওই সময়ে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ১ হাজার ৪২০টি ঘটনা শনাক্ত করেছেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া হাসপাতালগুলো দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বেশি মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেয় বলে গবেষকদের দাবি।
গবেষণাটিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ৪৯৩টি ঘটনা শনাক্ত হয়। তাদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকেরা এই প্রবণতাকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর বিষবৈজ্ঞানিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্যারাকোয়াটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে ৫৩ টনের কিছু বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল। এক দশক পর ২০২৩ সালে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে। অর্থাৎ একদিকে রাসায়নিকটির ভয়াবহ বিষক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষিতে এর ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এ সমস্যার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। গত জুলাই মাসে হাসপাতালটিতে বিষক্রিয়া নিয়ে ১১৭ জন রোগী ভর্তি হন। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের বড় একটি অংশ আগাছানাশক পান করেছিলেন। ঝিনাইদহে আত্মহত্যার প্রবণতা আগে থেকেই বেশি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিকের মাধ্যমে আত্মহত্যার চেষ্টা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্যারাকোয়াটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি শরীরে প্রবেশের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বিষক্রিয়ার পর ফুসফুস, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ক্রমে কমে গিয়ে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের বড় অংশই তরুণ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৭৮ দশমিক ২ শতাংশের বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আক্রান্তদের মধ্যে শিক্ষার্থীর হার ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং গৃহিণীর হার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। কৃষকদের হার ১৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু কৃষি খাতের শ্রমিক বা কৃষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
গবেষণার প্রধান লেখক চিকিৎসক ফজলে রাব্বি চৌধুরীর মতে, প্যারাকোয়াট ব্যবহারের সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা, পারকিনসন রোগ এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গবেষণা হয়েছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন।
প্যারাকোয়াটের বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো কার্যকর নির্দিষ্ট প্রতিষেধকের অনুপস্থিতি। আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হলেও কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিষক্রিয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও গুরুতর আক্রান্ত রোগীদের বাঁচানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় প্যারাকোয়াটের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ৭৭টির বেশি দেশে রাসায়নিকটি নিষিদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নেও দীর্ঘ আইনি ও বৈজ্ঞানিক বিতর্কের পর এর ব্যবহার বন্ধ করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায়ও প্যারাকোয়াট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করার সঙ্গে আত্মহত্যার হার কমার সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০০৬ সালে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করার পর কয়েক বছরের মধ্যে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, মানুষের সহজ নাগালের বাইরে এ ধরনের অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক রাখা গেলে বিষপানজনিত আত্মহত্যা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশেও প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করার দাবি নতুন নয়। টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা বলছেন, দেশে ইতিমধ্যে উচ্চ ঝুঁকির বিভিন্ন কীটনাশক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্যারাকোয়াটকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেশের নিবন্ধিত বিভিন্ন সক্রিয় কীটনাশক উপাদান বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকির কয়েকটি রাসায়নিক শনাক্ত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি না করে প্যারাকোয়াটের বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় রাসায়নিকটির ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে।
কৃষিতে প্যারাকোয়াটের জনপ্রিয়তার পেছনে অবশ্য বাস্তব কিছু কারণ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের সংকট, শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি এবং দ্রুত আগাছা পরিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা কৃষকদের রাসায়নিক আগাছানাশকের দিকে ঠেলে দিয়েছে। হাতে আগাছা পরিষ্কার করতে যেখানে বেশি শ্রম ও সময় লাগে, সেখানে রাসায়নিক প্রয়োগে অল্প সময়ে বড় জমির আগাছা দমন করা যায়।
তবে এই সুবিধার আড়ালে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে অনেক কৃষকই পর্যাপ্তভাবে জানেন না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার জুমচাষ থেকে শুরু করে চা-বাগান ও সমতলের কৃষিজমি—বিভিন্ন এলাকায় প্যারাকোয়াটের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে রাসায়নিকটির সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বেড়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যারাকোয়াটের বিকল্প হিসেবে সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিকভাবে আগাছা দমন এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকির কিছু আগাছানাশক ব্যবহার করা সম্ভব। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে উচ্চ ঝুঁকির রাসায়নিকের সরবরাহ ও বিক্রির ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্যারাকোয়াটসহ ক্ষতিকর রাসায়নিকের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কৃষি উৎপাদনের সুবিধা বিবেচনা করে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার চালু রাখা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং বিষপানজনিত মৃত্যুর বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে যে রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর হার এত বেশি এবং যার নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই, সেটির সহজলভ্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশে প্যারাকোয়াটের আমদানি ও ব্যবহার যেভাবে বেড়েছে, তার বিপরীতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। গবেষণার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন কিছু বিষক্রিয়ার ঘটনা নয়। বরং এটি কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় সমস্যা।
ফলে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার অব্যাহত থাকবে, নাকি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিষিদ্ধ করা হবে—এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা এবং জনস্বাস্থ্যের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠছে। কৃষকের আগাছা পরিষ্কারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে যেন মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে, সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বড় দায়িত্ব।