ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনায় একাধিক শ্রমিক হতাহত হওয়ার পর শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্টেশন রোড এলাকার ওই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজের অভ্যন্তরে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও শিল্প খাতের সংগঠনগুলো তদন্ত শুরু করে।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সদস্য সচিব নাজমুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এবং বিএসবিআরএর পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করার পাশাপাশি শিপইয়ার্ডে নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে।

বিএসবিআরএর পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটিতে পাঁচজনকে রাখা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সংগঠনটির টেকনিক্যাল উপদেষ্টা ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিএসবিআরএর উপদেষ্টা নাঈম শাহ ইমরান, টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট ক্যাপ্টেন সিরাজুল মওলা এবং এইচআর শিপ ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান। সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন বিএসবিআরএর সচিব নাজমুল ইসলাম।

কমিটিকে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকেও তদন্তের বিষয়টি জানানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জাহাজের ভেতরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুরোনো জাহাজ কাটার কাজ এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। জাহাজের বিভিন্ন বদ্ধ অংশে দীর্ঘদিন ধরে দাহ্য, বিষাক্ত কিংবা ক্ষতিকর গ্যাস ও রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ জমে থাকতে পারে। যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া এসব অংশে কাটিংয়ের কাজ শুরু করলে আগুন, বিস্ফোরণ কিংবা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে শ্রমিকদের গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

এ কারণে জাহাজ কাটার আগে গ্যাস পরীক্ষা এবং জাহাজটি গ্যাসমুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বদ্ধ জায়গায় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের দুর্ঘটনা এসব নিরাপত্তাবিধি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছিল, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ কেমন ছিল, কাটিং শুরুর আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং নিরাপত্তা তদারকিতে কোনো দুর্বলতা ছিল কি না—তদন্তে এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়ার কথা।

সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং শিল্প দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এ খাতের সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য নানা ধরনের ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে। পুরোনো জাহাজ ভাঙার সময় ভারী ধাতব কাঠামো, আগুন, বিস্ফোরণ, বিষাক্ত পদার্থ এবং বদ্ধ স্থানে কাজের মতো নানা বিপদ মোকাবিলা করতে হয় শ্রমিকদের। ফলে সামান্য অবহেলাও কখনো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ ধরনের দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের পরিবারের ওপর। একজন শ্রমিক আহত হলে শুধু তার চিকিৎসার বিষয়টি সামনে আসে না, তার পরিবারের আয়ও অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। আর প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে পরিবারটি হঠাৎ করেই একজন উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারায়। সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী বলেন, একজন শ্রমিকের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের জীবিকা, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে। তাই আহতদের সুচিকিৎসার পাশাপাশি নিহতদের পরিবারকে যথাযথ সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্ত কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তদন্তে যদি নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন, অবহেলা বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনে যে সুপারিশ থাকবে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাও জরুরি।

কারণ অতীতের অনেক দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এলে একই ধরনের দুর্ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত গ্যাস পরীক্ষা, প্রশিক্ষিত শ্রমিক নিয়োগ, মানসম্মত সুরক্ষা সরঞ্জাম, বদ্ধ স্থানে কাজের বিশেষ প্রটোকল এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কার্যকর রাখার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন নয়; এটি সীতাকুণ্ডের পুরো শিপ ব্রেকিং শিল্পে শ্রমিক সুরক্ষার বাস্তব চিত্র নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তিনটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী ছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মধ্য দিয়েই সামনে আসবে।

শ্রমিকদের প্রত্যাশা, তদন্ত যেন কেবল দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং দায় নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কারণ একটি দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হলেও হারিয়ে যাওয়া একটি জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত