‘১০০ কোটি দিলেও মাদকের টাকা নেব না’: ওসি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
‘১০০ কোটি দিলেও মাদকের টাকা নেব না’: ওসি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পিরোজপুরে মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও চুরির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম। সচেতনতামূলক এক সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি মাদক কারবারিদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অর্থ বা সুবিধা গ্রহণ না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

ওসির দেওয়া বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বক্তব্যে তিনি সাধারণ মানুষকে ভয় না পেয়ে সম্মিলিতভাবে অপরাধ প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সমাজে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তাদের প্রভাব কেন এত বেশি—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে পিরোজপুর পৌরসভায় মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও চুরির বিরুদ্ধে আয়োজিত সামাজিক প্রতিরোধমূলক সচেতনতামূলক সভায় এসব কথা বলেন ওসি শরিফুল ইসলাম।

সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, একজন মাদক কারবারি ইয়াবা বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও সেই অর্থের প্রতি তিনি আকৃষ্ট নন। এমনকি মাদক কারবারি ১০০ কোটি টাকা দিলেও তিনি তা নেবেন না—এমন বক্তব্য দেন তিনি। তার এই বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে অর্থ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

ওসি শরিফুল ইসলাম বলেন, সমাজকে ভালো করার দায়িত্ব মূলত সমাজের মানুষেরই। বাইরের কেউ এসে একটি সমাজের সব সমস্যা সমাধান করে দিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা না করে নিজেদের দায়িত্ব নিজেদেরই পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, “আমাদের সমাজ আমাদেরই ভালো করতে হবে। বাইরে থেকে কোনো জিন-পরী এসে সমাজ ভালো করে দেবে না।” বক্তব্যে তিনি চীন, রাশিয়া কিংবা আমেরিকার মতো রাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলেন, অন্য কোনো দেশ এসে বাংলাদেশের সমাজকে ভালো করে দেবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।

তার মতে, একটি পরিবারের সন্তান কীভাবে বড় হবে, তার ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে এবং সে অপরাধ ও মাদক থেকে কতটা দূরে থাকবে—এসব বিষয়ে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পুলিশ বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকলে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়।

অভিভাবকদের উদ্দেশে ওসি বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারের। বাড়ির আশপাশের কোনো সদস্য, জনপ্রতিনিধি কিংবা থানার ওসি এসে সবকিছু ঠিক করে দেবেন—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং তার আচরণে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকেও অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে।

বক্তব্যে তিনি সমাজে অপরাধীদের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। শরিফুল ইসলাম বলেন, সমাজে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক কারবারি পাঁচজন ও সন্ত্রাসী পাঁচজন হলে মোট অপরাধী ১০ জন। বিপরীতে সমাজে সাধারণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০০ জন।

এই বিপুলসংখ্যক মানুষ কীভাবে অল্পসংখ্যক অপরাধীর কাছে ভয় পেয়ে থাকে, সেটিই তার কাছে বিস্ময়ের বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। সাধারণ মানুষকে সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভয়কে জয় করে সবাইকে নিজেদের সমাজ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, “এই ৫০০ জনকে কীভাবে ওই ১০ জন ভয় দেখায়, আমি চিন্তা করে পাই না।” এরপর তিনি উপস্থিত মানুষকে মনে জোর রাখার আহ্বান জানান এবং বলেন, সমাজটি তাদের নিজেদের। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে ভালো থাকা সম্ভব।

ওসির বক্তব্যে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বও উঠে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু পুলিশি তৎপরতার মাধ্যমে মাদক, কিশোর অপরাধ কিংবা চাঁদাবাজির মতো সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।

বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবারের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। অবসর সময় কীভাবে কাটছে, বন্ধুদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন এবং অনলাইনে কী ধরনের পরিবেশে তারা যুক্ত হচ্ছে—এসব বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পিরোজপুর পৌরসভায় অনুষ্ঠিত সভাটিও ছিল এমন সামাজিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগের অংশ। মাদক ও সন্ত্রাসের পাশাপাশি কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও চুরির মতো অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আহসান কবির সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এস এম সাইদুল ইসলাম কিসমত। স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

ওসি শরিফুল ইসলামের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই তার দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। বিশেষ করে মাদক কারবারিদের অর্থের প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করার বক্তব্যটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য ভাইরাল হওয়ার ক্ষেত্রে পুরো বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

মাদকবিরোধী লড়াইয়ে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ, ওসির বক্তব্যে সেই বিষয়টিই জোর দিয়ে উঠে এসেছে। তার বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বার্তা হলো—অপরাধীদের ভয় না পেয়ে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় পরিবারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে এমন সামাজিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে সচেতনতার পাশাপাশি আইন প্রয়োগ, পারিবারিক নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ওপর। কারণ অপরাধ দমনের দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়; নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্বও সমাজের প্রতিটি মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত