প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে চিকিৎসার মান ও সুযোগ-সুবিধা এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সরকার কাজ করছে, যাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষকে আর বিদেশে যেতে না হয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সম্প্রসারিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা নয়; দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকেও মানসম্মত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ের কথা উঠে আসে। তিনি বলেন, এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার, যেখানে চিকিৎসার জন্য নাগরিকদের দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। পাশাপাশি অর্থের অভাবে কোনো মানুষ যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী অক্টোবর মাসে পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেশের ভেতরেই সম্প্রসারণের মাধ্যমে চিকিৎসার সুযোগ আরও সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগের পাশাপাশি চিকিৎসার মান উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, চিকিৎসার মান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে।
এদিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নতুন ৫০০ শয্যার ভবন চালু হওয়ায় দেশের নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসাব্যবস্থায় নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলো। সম্প্রসারিত ভবনটি ১৫ তলাবিশিষ্ট। এর নিচের তিনটি তলা বেজমেন্ট হিসেবে রাখা হয়েছে। সেখানে পার্কিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সার্ভিস ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে। ভবনের ওপরের ১২ তলায় রোগীদের চিকিৎসা ও সেবার জন্য বিভিন্ন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।
নতুন ভবনে ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার এবং ডায়াগনস্টিক ইউনিটের পাশাপাশি রয়েছে নিবিড় পরিচর্যার বিশেষ ব্যবস্থা। সেখানে ৪০টি আইসিইউ বেড, ২৪টি পোস্ট-অপারেটিভ বেড এবং ১১২টি কেবিন রয়েছে। ফলে জটিল নিউরোলজিক্যাল রোগীদের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পরবর্তী পর্যায়ের সেবা দেওয়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নিউরোলজিক্যাল রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছে। রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। নতুন ভবন চালুর ফলে রোগী ব্যবস্থাপনা এবং শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার পরিসরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। স্ট্রোকের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নেন। নিউরোলজিক্যাল বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসার জন্যও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগীরা এই হাসপাতালে আসেন।
পার্কিনসন্স, ডিমেনশিয়া, গিলেন-ব্যারে সিনড্রোম, মৃগী ও হাইড্রোকেফালাসসহ বিভিন্ন স্নায়ুরোগের চিকিৎসা এখানে দেওয়া হয়। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক রোগীদের জন্যও নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসাসেবা রয়েছে। ফলে নতুন ভবনের অতিরিক্ত সক্ষমতা জটিল রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য অনেক রোগী ও তাদের স্বজনকে বিদেশমুখী হতে দেখা যায়। বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রোপচারের সুযোগ সীমিত হওয়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং দীর্ঘ অপেক্ষার মতো নানা কারণে অনেকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বিদেশে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকে অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয়, থাকা-খাওয়ার খরচ এবং চিকিৎসার বিপুল আর্থিক চাপ। মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যয় অনেক সময় পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে দেয়। ফলে দেশে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো হলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থের অভাবে কেউ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হওয়ার যে প্রতিশ্রুতি এসেছে, তা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জনবান্ধব করার প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। বাস্তবে এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা, জরুরি চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানী থেকে দূরের রোগীদের জন্যও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এতে রোগী ও স্বজনদের সময়, অর্থ এবং মানসিক চাপ বাড়ে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রাজধানীমুখী রোগীর চাপও কমতে পারে।
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের সম্প্রসারণ সেই বৃহত্তর স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে স্ট্রোক ও দুর্ঘটনাজনিত মস্তিষ্কের আঘাতের মতো জরুরি রোগে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ, অস্ত্রোপচার এবং ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়লে জটিল রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার সুযোগও বাড়তে পারে।
সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে নতুন অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা। আধুনিক যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা সক্ষমতা এবং রোগীদের জন্য সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে এর সুফল সবচেয়ে বেশি পাবেন সাধারণ মানুষ। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হওয়ার নিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয় বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
আগারগাঁওয়ের নতুন ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সেই পরিবর্তনের অবকাঠামোগত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হলো। এখন এই সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে মূল বিষয়।