৫০–৬০ ডলারে স্মার্টফোন, সাশ্রয়ী ডিভাইসের উদ্যোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
৫০–৬০ ডলারে স্মার্টফোন, সাশ্রয়ী ডিভাইসের উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের মানুষের হাতে তুলনামূলক কম দামে ডেটা ব্যবহারের উপযোগী স্মার্টফোন পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক স্মার্টফোনের দাম ৫০ থেকে ৬০ মার্কিন ডলারের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই দাম প্রায় ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার ২০০ টাকার সমপরিমাণ। তবে স্থানীয় বাজারে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে উৎপাদন, বিপণন ও অন্যান্য ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে।

বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ‘পাওয়ারিং দ্য ফিউচার: রবি কমপ্লিটস ঢাকা মডার্নাইজেশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি সাশ্রয়ী স্মার্টফোনের এই পরিকল্পনার কথা জানান। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু কম দামে একটি মোবাইল ডিভাইস মানুষের হাতে তুলে দেওয়া নয়; বরং দেশের বিপুলসংখ্যক ফিচার ফোন ব্যবহারকারীকে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট ও ডেটাভিত্তিক ডিজিটাল সেবার আওতায় নিয়ে আসা।

অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা বলেন, দেশের বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্মার্টফোনের দাম কমানো প্রয়োজন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য স্মার্টফোন এখন আর কেবল যোগাযোগের যন্ত্র নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, অনলাইন কেনাকাটা, কর্মসংস্থান এবং তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মোবাইল ইন্টারনেট ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু তুলনামূলক বেশি দামের কারণে এখনো দেশের একটি বড় অংশ আধুনিক স্মার্টফোন ব্যবহারের বাইরে রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় মোবাইল ফোন নির্মাতা, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে বাজেটের আগে আলোচনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ওই আলোচনার ধারাবাহিকতায় মোবাইল ফোন উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর আরোপিত কর, ভ্যাট ও শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে যেসব কাঁচামালের ক্ষেত্রে ২৬ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কর, ভ্যাট ও শুল্ক দিতে হতো, সেসবের অনেক ক্ষেত্রেই এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। কোনো কোনো উপকরণের ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর শূন্য করা হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে তা ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।

সরকারের ধারণা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশীয় নির্মাতারা আরও কম দামে স্মার্টফোন বাজারজাত করতে সক্ষম হবে। সংশ্লিষ্ট নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক ডেটা স্মার্টফোন উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ধরনের ডিভাইস তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানান উপদেষ্টা।

তবে কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদনের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ বাজারে কোনো পণ্যের দাম কম হলেও এককালীন সেই অর্থ পরিশোধ করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হতে পারে। এ কারণে স্মার্টফোন কেনায় কিস্তি সুবিধা চালুর বিষয়েও সরকার কাজ করছে।

রেহান আসিফ আসাদ জানান, মোবাইল ফোনকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইএমআই কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কিস্তি সুবিধা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এমন ব্যবস্থা চালু হলে একবারে পুরো অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে মাসিক কিস্তিতে ডিভাইস কেনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে সীমিত আয়ের অনেক মানুষের জন্য স্মার্টফোন কেনা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

বাংলাদেশে ডিজিটাল সংযোগ বাড়লেও এখনো ফিচার ফোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা জানান, দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মোবাইল ব্যবহারকারী এখনো ফিচার ফোন ব্যবহার করছেন। মোট মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি ধরে নিলে ফিচার ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি হতে পারে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে ডেটা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসাকে ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।

ফিচার ফোন থেকে স্মার্টফোনে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মোবাইল নেটওয়ার্কের মানও সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ স্মার্টফোন হাতে থাকলেও নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে এর পূর্ণ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে সাশ্রয়ী ডিভাইসের পাশাপাশি উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে মোবাইল অপারেটরদের উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, উন্নত ডেটা নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফিচার ফোন ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোন ও ডেটা ব্যবহারের দিকে নিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ডিজিটাল ব্যবহারের চিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নিম্ন আয়ের কর্মজীবী এবং গ্রামীণ এলাকার মানুষের জন্য কম দামের স্মার্টফোন নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারেন, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ডিজিটাল লেনদেন ও অনলাইন বিপণনে যুক্ত হতে পারেন, আবার একজন চাকরিপ্রার্থী অনলাইনে চাকরির আবেদন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নিতে পারেন।

তবে এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু ফোনের দাম কমানোর ওপর নির্ভর করবে না। ডিভাইসের মান, ব্যাটারি সক্ষমতা, সফটওয়্যার আপডেট, ইন্টারনেটের মূল্য, নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি এবং গ্রাহকসেবার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কম দামে ফোন বাজারে এলেও সেটি যদি দীর্ঘস্থায়ী না হয় বা প্রয়োজনীয় অ্যাপ ও সেবা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে দেশে মোবাইল ফোন শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও কর কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন বাড়লে স্থানীয় কারখানাগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় প্রযুক্তি খাতের বিকাশ ঘটতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্মার্টফোনের দাম ৫০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা তাই কেবল একটি নতুন ডিভাইস বাজারজাত করার উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার বিষয়টি জড়িয়ে আছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং বাজারে সত্যিই কতটা সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে স্মার্টফোন পৌঁছানো সম্ভব হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত