প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রাজনীতিতে কওমি ঘরানার ইসলামী দলগুলোকে ঘিরে নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দলকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা এখন ধীরে ধীরে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে নীতিগত ঐক্যের আলোচনা ইতোমধ্যে হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি, নেতৃত্ব কাঠামো, নির্বাচন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতবিনিময় চলছে।
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে কওমি ঘরানার সাতটি রাজনৈতিক দল। এগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। গত জুলাইয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসায় এসব দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বৃহত্তর ঐক্য ও সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয় এবং পরবর্তী সময়ে দলগুলো নিজেদের প্রস্তাব ও রূপরেখা দেয়।
এই উদ্যোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়েছে সাত দলের অবস্থান বিবেচনায়। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর কয়েকটি বর্তমানে বা সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে কওমি ঘরানার দলগুলো যদি হেফাজতের মধ্যস্থতায় পৃথক একটি সমন্বিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে এগিয়ে যায়, তাহলে ইসলামী রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে সংশ্লিষ্ট নেতারা এখনো এটিকে চূড়ান্ত রাজনৈতিক জোট হিসেবে ঘোষণা করেননি; বরং নীতিগত ঐক্য ও সমন্বয়ের প্রক্রিয়া হিসেবে বিষয়টিকে দেখছেন।
সাত দলের প্রস্তাবনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আদর্শিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি। বিশেষ করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শকে ঐক্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার কথা এসেছে কয়েকটি দলের বক্তব্যে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এবং ইসলামী ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত দলগুলোর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানের মধ্যে মৌলিক সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
তবে ঐক্যের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, নতুন এই প্ল্যাটফর্মে থাকা দলগুলো একই সময়ে অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি না। এ বিষয়ে সাত দলের মধ্যে এখনো পুরোপুরি অভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়নি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নতুন সমঝোতায় থাকা দলগুলোর অন্য রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে আলাদা সমঝোতা বা ঐক্যে না থাকার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও অন্য বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনে করছে, নতুন ঐক্যের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থানের সরাসরি সংঘাত থাকা প্রয়োজন নেই।
নির্বাচনী কৌশল নিয়েও রয়েছে ভিন্নতা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সাত দলের সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তে প্রতিটি দলের নিজস্ব এখতিয়ার থাকার কথা বলছে। অর্থাৎ ধর্মীয় ও আদর্শিক বিষয়ে ঐক্য তৈরি হলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে দলগুলো কতটা অভিন্ন সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নতুন জোটের সম্ভাব্য সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব সামনে এসেছে। সাত দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটি দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে এমন একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। আবার বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের পক্ষ থেকে সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরা গঠনের প্রস্তাব এসেছে। দলটির প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন কর্মসূচি ও বৈঠকে শরিক দলগুলোর আমিররা পর্যায়ক্রমে নেতৃত্ব দিতে পারেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকেও নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নতুন কোনো দলকে ভবিষ্যতে এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় সাত দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নতুন কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে শূরা ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ আলোচনার মাধ্যমে নতুন দল অন্তর্ভুক্তির পক্ষে। এতে বোঝা যায়, সম্ভাব্য জোটটি শুধু বর্তমান সাত দলের সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার চিন্তাও রয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। কয়েকটি দলের প্রস্তাবনায় হেফাজতের মধ্যস্থতা বা তত্ত্বাবধানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কতটা থাকবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হেফাজত যদি শেষ পর্যন্ত একটি সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করে, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব সাংগঠনিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দিক থেকেও উদ্যোগটি তাৎপর্যপূর্ণ। কওমি ঘরানার বিভিন্ন দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অবস্থান, নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল এবং বড় দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব দলের একাংশ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক বলয়ে এবং অন্য অংশ ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে অবস্থান নেওয়ায় কওমি রাজনৈতিক পরিসরে বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। হেফাজতের উদ্যোগ সেই বিভাজন কমিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে নতুন এই উদ্যোগের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আদর্শিক বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও নির্বাচনী আসন সমঝোতা, নেতৃত্বের ক্ষমতা বণ্টন, অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান নির্ধারণে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব দল ইতোমধ্যে অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে, তাদের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে—তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখন পর্যন্ত সাত দলের মধ্যে নীতিগতভাবে একসঙ্গে পথ চলার আগ্রহ স্পষ্ট হলেও আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জোটের কাঠামো চূড়ান্ত হয়নি। সামনে আরও বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নির্বাচনী কৌশল এবং হেফাজতের ভূমিকা নির্ধারিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এটি শেষ পর্যন্ত কেবল ইসলামী দলগুলোর একটি সমন্বয় কাঠামো হবে, নাকি জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জোটে রূপ নেবে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক ও কওমি ঘরানার দলগুলোর ভোট ও সাংগঠনিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। সেই শক্তিকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোয় আনার উদ্যোগ সফল হলে ইসলামী রাজনীতির ভেতরের সমীকরণ যেমন বদলাতে পারে, তেমনি বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটগুলোর কৌশলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের বাস্তব রূপ নির্ভর করবে সাত দলের পারস্পরিক আস্থা, সাংগঠনিক সমঝোতা এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা কতটা অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করতে পারে তার ওপর।