প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত বিস্তৃত হলেও শহর ও গ্রামের মধ্যে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান ও সুযোগ-সুবিধায় এখনো পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনেক মানুষ নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং মানসম্মত ভয়েস কল থেকে বঞ্চিত হন। এমন বাস্তবতায় শহরকেন্দ্রিক বিনিয়োগের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে মোবাইল অপারেটরদের আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মোবাইল অপারেটর রবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। ঢাকাজুড়ে রবির নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরতে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। সেখানে মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়িক বিবেচনায় শহরাঞ্চলে বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি লাভজনক হলেও দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নত মোবাইল সেবা থেকে বঞ্চিত রাখার সুযোগ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা ও সরকারি সেবার সঙ্গে মোবাইল যোগাযোগ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করে অপারেটরদের ব্যবসায়িক সুবিধা তুলনামূলক কম হতে পারে। জনসংখ্যার ঘনত্ব কম হওয়ায় একটি টাওয়ার বা সাইট থেকে গ্রাহকসংখ্যাও কম পাওয়া যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অপারেটরদের বিনিয়োগের বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। কিন্তু দেশের সব নাগরিককে সমানভাবে ডিজিটাল যোগাযোগের আওতায় আনতে হলে এ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
নিজের নির্বাচনী এলাকার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, গ্রামাঞ্চলে গেলে মানুষের হাতে রবির সিম তুলনামূলক কম দেখা যায়। এ অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি গ্রামীণ এলাকায় রবির নেটওয়ার্ক ও সেবার বিস্তৃতি আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, কোনো একটি অপারেটরের সেবা যদি নির্দিষ্ট অঞ্চলে দুর্বল থাকে, তাহলে সেই এলাকার মানুষ ডিজিটাল অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার পূর্ণ সুবিধা থেকে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
বর্তমানে মোবাইল ফোন শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়। কৃষকরা বাজারদর জানতে, ব্যবসায়ীরা ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা গ্রহণ করতে এবং সাধারণ মানুষ সরকারি ও আর্থিক সেবা নিতে মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকা মানে শুধু ফোনে কথা বলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, তথ্যপ্রাপ্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগের বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।
গ্রামাঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অবকাঠামো ব্যয় কমানোর জন্য টাওয়ার শেয়ারিংয়ের সুযোগ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, একাধিক মোবাইল অপারেটর একই অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারলে দুর্গম ও কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন নেটওয়ার্ক স্থাপনের ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণের সময় ও জটিলতাও কমতে পারে। ফলে যেসব এলাকায় পৃথকভাবে টাওয়ার স্থাপন করা অপারেটরদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে কঠিন, সেসব এলাকাতেও যৌথ অবকাঠামোর মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে রবি তাদের বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের সাম্প্রতিক অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিন মাসে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় চার হাজার ৮০০টির বেশি সাইট আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সর্বোচ্চ ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। একই সময়ে কল ড্রপের হার ২০ শতাংশ কমেছে বলেও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের ফলে ঢাকা ও গাজীপুরে ঘরের ভেতরের নেটওয়ার্ক কাভারেজ আগের তুলনায় তিনগুণ হয়েছে বলেও রবির পক্ষ থেকে জানানো হয়। শহরাঞ্চলে ভবন, আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক স্থাপনার ভেতরে ভালো নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা বর্তমানে অপারেটরদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বহুতল ভবন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও কংক্রিটের স্থাপনায় মোবাইল সিগন্যালের মান ধরে রাখতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন হচ্ছে।
তবে এত বড় পরিসরে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের পরও দেশের সব এলাকায় কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন রবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াদ সাতারা। তিনি বলেন, নতুন সাইট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে শুধু প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গা পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অবকাঠামোগত সহযোগিতা, টাওয়ার শেয়ারিং এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে জমির অবস্থান, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সড়ক যোগাযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগসহ বিভিন্ন বাস্তব বিষয় বিবেচনা করতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি সাইট স্থাপন করার পর সেটি নিয়মিত সচল রাখাও শহরের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সেবার মান এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। গ্রাহক ভালো সেবা পেলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে। তাঁর বক্তব্যে গ্রাহকের অভিজ্ঞতা ও সেবার মানকে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখার বিষয়টি উঠে আসে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, মাত্র তিন মাসে প্রায় পাঁচ হাজার সাইটে কাজ শেষ করা একটি বড় অর্জন। তাঁর মতে, দেশের ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে এ ধরনের নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা এখন ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-কমার্স, টেলিমেডিসিন, অনলাইন শিক্ষা এবং কৃষি তথ্যসেবা গ্রামের মানুষের জীবনেও প্রবেশ করেছে। কিন্তু দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে এসব সেবা ব্যবহারে বাধা তৈরি হলে ডিজিটাল উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে না।
গ্রামের একজন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে না পারা, একজন কৃষক সময়মতো বাজারদর জানতে না পারা কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অনলাইন লেনদেন করতে না পারা—এসব ছোট ছোট সমস্যার পেছনে দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই গ্রামীণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণকে শুধু টেলিযোগাযোগ ব্যবসার অংশ হিসেবে না দেখে দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল ব্যবধান কমাতে সরকারি নীতি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহযোগিতা এবং বেসরকারি অপারেটরদের বিনিয়োগ—এই তিনটির সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে অবকাঠামো ভাগাভাগি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য কার্যকর বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও শহরের মানুষের মতো নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবার সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
গ্রামাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক বাড়ানোর তাগিদ তাই কেবল একটি অপারেটরের প্রতি আহ্বান নয়; এটি দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির বৃহত্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা যত বেশি মানুষের কাছে সমান মানে পৌঁছাবে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগও তত বিস্তৃত হবে। আর সেই লক্ষ্য পূরণে শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামকে নেটওয়ার্ক বিনিয়োগের অগ্রাধিকার তালিকায় আনা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।