প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরিদপুরের নগরকান্দায় কেন্দ্রীয় কালী মন্দির থেকে চুরি হওয়া দুটি পিতলের মূর্তি উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় উপজেলার জুঙ্গুরদী গ্রামে অভিযান চালিয়ে একটি বাড়ির আঙিনা থেকে মূর্তি দুটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া মূর্তিগুলোর মোট ওজন প্রায় ২২ কেজি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জুঙ্গুরদী গ্রামের শিয়াব মুন্সি, শশা গ্রামের রুমান তালুকদার, ছাগলদী গ্রামের মহাসিন শেখ এবং জুঙ্গুরদী গ্রামের আবির আহমেদ। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে তাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে মূর্তি দুটি উদ্ধার করা হয়। তবে চুরির ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার রাতে নিয়মিতভাবে মন্দিরে তালা দিয়ে বাসায় যান সেবায়েত রমা চক্রবর্তী। পরদিন সোমবার সকালে পূজা দিতে এসে তিনি মন্দিরের দরজার তালা ভাঙা দেখতে পান। ভেতরে প্রবেশের পর দেখা যায়, মন্দিরে থাকা দুটি পিতলের মূর্তি নেই। সকালে এমন দৃশ্য দেখে মন্দিরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
পরে বিষয়টি মন্দির কমিটির সদস্যদের জানানো হয়। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে নগরকান্দা থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। মন্দিরের তালা ভাঙার ঘটনা এবং মূর্তি দুটি কীভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চুরি যাওয়া মূর্তিগুলোর মোট ওজন প্রায় ২২ কেজি হওয়ায় সেগুলো সরিয়ে নিতে একাধিক ব্যক্তির সহযোগিতা প্রয়োজন হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মন্দিরের আশপাশের এলাকা, সম্ভাব্য যাতায়াতের পথ এবং চুরির পর মূর্তি কোথায় রাখা হয়েছিল—এসব বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জুঙ্গুরদী গ্রামের একটি বাড়ির আঙিনায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে মোস্তফা মোল্লার বাড়ির আঙিনা থেকে চুরি হওয়া পিতলের মূর্তি দুটি উদ্ধার করা হয়।
অভিযানের সময় নগরকান্দা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আল ফাহাদ, নগরকান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ রাসুল সামদানী আজাদ, ওসি তদন্ত রাজ্জাকসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের উপস্থিতিতে মূর্তি দুটি উদ্ধার করা হয় এবং সেগুলো জব্দ করে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
নগরকান্দা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আল ফাহাদ জানিয়েছেন, মন্দির থেকে চুরি হওয়া মূল্যবান দুটি মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে এবং ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চুরির সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মূর্তি দুটি মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলছে। সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় জব্দ করা সামগ্রী আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রকৃত মালিক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে মূর্তি দুটি মন্দিরে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
মন্দিরে চুরির ঘটনা স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছিল। ধর্মীয় উপাসনালয়ে থাকা মূর্তি শুধু ধাতব বা মূল্যবান বস্তু হিসেবে বিবেচিত নয়; সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের কাছে এগুলোর ধর্মীয় ও আবেগগত গুরুত্ব রয়েছে। ফলে চুরির পর মূর্তি উদ্ধার হওয়ায় মন্দিরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে চুরির ঘটনা সংবেদনশীল। এ ধরনের ঘটনায় মূল্যবান সামগ্রী চুরির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টিও জড়িত থাকে। একটি মন্দিরে চুরির ঘটনা অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত করে চুরি যাওয়া সামগ্রী উদ্ধার এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
নগরকান্দার এই ঘটনায় পুলিশের দ্রুত তৎপরতায় চুরি যাওয়া মূর্তি উদ্ধার হওয়ায় তদন্তে অগ্রগতি এসেছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে মূর্তি চুরির পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার পূর্ণ চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে। চুরির আগে ও পরে তাঁদের গতিবিধি, মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মূর্তি দুটি কোথায়, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে রাখা হয়েছিল, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হবে এবং ভবিষ্যতে ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হবে। বিশেষ করে রাতের সময়ে মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তালা ও প্রবেশপথের নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
নগরকান্দার কেন্দ্রীয় কালী মন্দিরের চুরি যাওয়া দুটি মূর্তি উদ্ধার এবং চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় আপাতত তদন্তে স্বস্তি ফিরলেও পুরো ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। মূর্তি উদ্ধার হলেও চুরির পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তদন্তের ফলই নির্ধারণ করবে ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।