বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বে থমকে গেছে সেবামূলক কাজ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বে থমকে গেছে সেবামূলক কাজ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনার কয়রা উপজেলায় স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও সমন্বয়হীনতার প্রভাব পড়েছে সরকারি বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমে। সুবিধাভোগী নির্বাচন, সরকারি সহায়তার তালিকা তৈরি এবং ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য কর্মী নিয়োগসহ কয়েকটি কার্যক্রমে রাজনৈতিক চাপ ও পাল্টাপাল্টি সুপারিশের অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রশাসনের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন পক্ষের সুপারিশ ও চাপের কারণে কিছু ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে সুবিধাভোগী বা কর্মী নির্বাচন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে যেসব সরকারি কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া, সেগুলোর কিছু কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। বিশেষ করে লবণাক্ততাপ্রবণ কয়রায় নিরাপদ খাবার পানির সংকটের মধ্যে পানি সংরক্ষণের ট্যাংক বিতরণ আটকে যাওয়ার বিষয়টি স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়েছে।

কয়রা খুলনার উপকূলীয় একটি উপজেলা। নদী, খাল ও জলাভূমিবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নিরাপদ পানির সংকটের সঙ্গে লড়াই করে আসছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়। এমন বাস্তবতায় সরকারি সেবার কোনো কার্যক্রম রাজনৈতিক বিরোধের কারণে আটকে গেলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে।

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ঘটনাটিও আলোচনায় এসেছে। উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশিত নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য কয়রায় তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারি নোটিশটি জুলাই মাসে প্রকাশ করা হয়। পরে নিয়োগ পরীক্ষা ও প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ড শুমারির জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের লক্ষ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা চললেও রাজনৈতিক বিরোধ ও চাপের কারণে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে জটিলতা তৈরি হয়। এর আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল।

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির এই নিয়োগ কার্যক্রমের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত তথ্য সংগ্রহকারীরা বিভিন্ন পরিবারের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে সংশ্লিষ্ট তথ্যভাণ্ডার। তাই এখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে কয়রায় নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি ও অন্যান্য উৎসের পানি সংরক্ষণের জন্য প্লাস্টিকের পানির ট্যাংক বিতরণ করা হতো। এসব ট্যাংকের ধারণক্ষমতা তিন হাজার থেকে ১৫ হাজার লিটার পর্যন্ত। কিন্তু সুবিধাভোগীদের চূড়ান্ত তালিকা না পাওয়ায় বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানি সংরক্ষণের ট্যাংকের জন্য আবেদন করেও অনেকে দীর্ঘদিন ধরে তা পাচ্ছেন না। উপকূলীয় এলাকার মানুষের কাছে এটি শুধু একটি সরকারি সহায়তা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। শুকনো মৌসুমে নিরাপদ পানির সংকট বাড়লে একটি পরিবারকে দূরবর্তী স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। ফলে একটি পানির ট্যাংক অনেক পরিবারের জন্য স্বস্তির বড় উৎস হতে পারে।

কয়রা উপজেলার কালনা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, তাঁরা কয়েক মাস আগে ট্যাংকের জন্য আবেদন করলেও এখনো তা পাননি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে তালিকা ও স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয়সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু সেই বিরোধের প্রভাব তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে এসে পড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কাছ থেকে আলাদা আলাদা সুপারিশ বা তালিকা আসায় চূড়ান্ত তালিকা তৈরিতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারি নীতিমালা ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন করা। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক চাপ বা প্রভাবের অভিযোগ থাকলে সেই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কয়রার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশের দাবি, নির্ধারিত মসজিদগুলোর জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর পছন্দের লোক অন্তর্ভুক্ত করার চাপ রয়েছে। এতে নিরপেক্ষভাবে তালিকা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। সরকারি কোনো সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় যদি প্রাধান্য পায়, তাহলে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষ বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একইভাবে সরকারি কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।

কয়রা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই রাজনৈতিক দলের টানাপোড়েনের কারণে প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেমন বিব্রত হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষও দুর্ভোগে পড়ছেন। তিনি দ্রুত সমস্যার সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক বিরোধ যেন সরকারি সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমীন বাবুলের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্য জামায়াতের হওয়ায় তাঁদের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি সুবিধাভোগী নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়ছে এবং বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

দুই পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই প্রশাসনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল বাকী জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিধিবিধান ও সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। রাজনৈতিক সুপারিশ বা চাপ প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে কখনো কখনো দেরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে প্রশাসনিক সেবা থেকে আলাদা রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সরকারি সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, নিয়োগ কিংবা জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত কার্যক্রমে সেই বিরোধের প্রভাব পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হন রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকরা।

বিশেষ করে কয়রার মতো উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি সহায়তার বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে একটি তালিকা প্রকাশে বিলম্ব কিংবা একটি প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্ধারণ আটকে যাওয়ার অর্থ অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সরকারি সেবা বন্ধ বা বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগ তাই শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি বিষয়।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মতো বড় সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ ও সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কয়রায় এ কর্মসূচির জন্য তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান ছিল। একই সময়ে নিরাপদ পানির ট্যাংক বিতরণসহ অন্যান্য সামাজিক সেবার কার্যক্রমও যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ দ্রুত সমাধানের পথে যাবে এবং সরকারি সেবা কোনো পক্ষের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে আটকে থাকবে না। তাঁদের কাছে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো সরকারি সুবিধা পাওয়া। একজন দরিদ্র পরিবার যখন খাদ্য সহায়তার অপেক্ষায় থাকে, একজন চাকরিপ্রার্থী যখন নিয়োগের ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন কিংবা একজন উপকূলীয় বাসিন্দা যখন নিরাপদ পানির জন্য সরকারি ট্যাংকের আশায় থাকেন, তখন রাজনৈতিক বিরোধ তাঁদের জন্য কোনো সমাধান তৈরি করে না।

প্রশাসনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি সুবিধাভোগী নির্বাচন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ, রাজনৈতিক সুপারিশের বাইরে যাচাই-বাছাই এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রকাশ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে বিরোধের সুযোগও কমবে।

কয়রার বর্তমান পরিস্থিতি তাই স্থানীয় রাজনীতির দ্বন্দ্বের পাশাপাশি সরকারি সেবা ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষের অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এটাই এখন স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কারণ সরকারি সেবা কোনো দল বা গোষ্ঠীর জন্য নয়; রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত