একীভূত হলো বিডা, বেজা ও পিপিপিএ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
একীভূত হলো বিডা, বেজা ও পিপিপিএ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ নামে নতুন একটি একক বিনিয়োগ উন্নয়ন কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবাকে আরও সহজ করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কমানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি ও সমন্বয়হীনতা কমিয়ে আনা।

‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর সরকারের নির্ধারিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কর্তৃপক্ষ দেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে।

নতুন আইনটি এমন একটি সময়ে কার্যকর হলো, যখন বাংলাদেশ দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের অন্যতম জায়গা ছিল বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদন, নিবন্ধন, লাইসেন্স ও অন্যান্য সেবা পেতে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা। একই ধরনের বা পরস্পর সম্পর্কিত দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগত। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সেই জটিলতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

আইনটি সংসদে পাস হয় ১৫ জুলাই ২০২৬। এরপর রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইন কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বিডার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নতুন কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের সেবা, শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবে।

নতুন আইনের ফলে আগের কয়েকটি আইন বাতিল বা প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বগুলো নতুন কর্তৃপক্ষের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে বিডা, বেজা ও পিপিপিএর প্রশাসনিক কার্যক্রম, সম্পদ, দায়-দেনা, চুক্তি, মামলা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এতে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি কমবে এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়বে।

নতুন কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে দেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগ প্রচার, শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমন্বিত হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীকে সাধারণত জমি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবেশ, কর, নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি এবং অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো একটির বিলম্ব পুরো বিনিয়োগ প্রকল্পের সময়সূচিকে পিছিয়ে দিতে পারে। ফলে একক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমন্বিত সেবা দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগকারীদের সময় ও প্রশাসনিক ব্যয় কমতে পারে।

এই সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিনিয়োগ সেবার ডিজিটাল রূপান্তর। নতুন ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীদের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও একক প্রবেশপথের ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং পূর্বানুমানযোগ্য করা। ইতোমধ্যে সরকারের বিনিয়োগসেবা ডিজিটালভাবে একীভূত করার উদ্যোগের সঙ্গে নতুন আইনের কাঠামোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার জায়গা হবে বাস্তবায়নের গতি। একটি প্রতিষ্ঠান একীভূত করলেই প্রশাসনিক জটিলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হবে না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব, জনবল, প্রযুক্তি, অনুমোদন ব্যবস্থা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কীভাবে নতুন কাঠামোর মধ্যে কার্যকরভাবে সমন্বয় করা হবে, তার ওপর সংস্কারের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে। বিশেষজ্ঞদের আলোচনাতেও উঠে এসেছে, শুধু প্রতিষ্ঠান একীভূত করার পাশাপাশি বিনিয়োগসংক্রান্ত অতিরিক্ত অনুমোদন ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কমানো জরুরি।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য নতুন কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশাসনিক বিলম্ব কমানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত ও সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বিনিয়োগ এলে শুধু মূলধন প্রবাহ বাড়ে না, এর সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন ও ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করা হলে তার প্রভাব বৃহত্তর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্পগুলো অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবহন, জ্বালানি, নগর অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতে বেসরকারি অর্থায়ন ও দক্ষতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে পিপিপি কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নতুন কর্তৃপক্ষের আওতায় বিনিয়োগ উন্নয়ন ও পিপিপি কার্যক্রমের সমন্বয় হলে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ আরও সংগঠিত হতে পারে।

নতুন কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায়ের গভর্নিং বোর্ডে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব রাখার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। অর্থ, শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ভূমি এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বোর্ডে রাখার কথা রয়েছে। বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদেরও এতে যুক্ত করার বিধান রয়েছে।

দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্যের নেতৃত্বে কর্তৃপক্ষ পরিচালিত হওয়ার কাঠামোও নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় তৈরির চেষ্টা রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে প্রতিফলিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নতুন কর্তৃপক্ষের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও কার্যপদ্ধতিকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস, চলমান প্রকল্প ও চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা, মামলা ও দায়-দেনার ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থাকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। এসব প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য উল্টো সাময়িক জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

এ কারণে আইন কার্যকর হওয়ার পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর বাস্তব প্রয়োগ। বিনিয়োগকারীরা কাগজে-কলমে নতুন একটি কর্তৃপক্ষের চেয়ে বাস্তবে দ্রুত অনুমোদন, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত, সহজ যোগাযোগ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেবেন। নতুন ব্যবস্থা যদি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে বিডা, বেজা ও পিপিপিএকে একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন এই সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর সক্ষমতা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, ডিজিটাল সেবা বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বাস্তবিক অর্থে আমলাতান্ত্রিক বাধা কতটা কমানো যায় তার ওপর। বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা থেকে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে, তার বাস্তব ফল মিললে উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং শেষ পর্যন্ত দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত