যুদ্ধের ধাক্কায় লেবাননের অর্থনীতি সংকুচিত হবে ৬.৪ শতাংশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
যুদ্ধের ধাক্কায় লেবাননের অর্থনীতি সংকুচিত হবে ৬.৪ শতাংশ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের জেরে চলতি বছর লেবাননের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকোচনের মুখে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটির প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে। যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আবারও বড় ধাক্কা খেয়েছে। পর্যটন খাতে পতন, মানুষের ভোগব্যয় কমে যাওয়া, পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি—সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতিতে গভীর চাপ তৈরি হয়েছে।

লেবানন ২০১৯ সাল থেকেই ভয়াবহ আর্থিক ও ব্যাংকিং সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার সংকটের কারণে মানুষের আয় ও সঞ্চয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনীতির দুর্বল ভিত্তিকে আরও নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সংঘাত শুরুর আগে লেবাননের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৪ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে আর্থিক সংকট শুরু হওয়ার পর এটি দেশটির সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের নতুন ধাক্কায় সেই পুনরুদ্ধারের গতি কার্যত থমকে গেছে।

লেবাননের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করেন। পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহন এবং ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ উপকৃত হন। কিন্তু যুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যটকদের আগমন কমে গেলে এসব খাতে সরাসরি প্রভাব পড়ে। বিশ্বব্যাংকও চলতি বছর অর্থনৈতিক সংকোচনের অন্যতম কারণ হিসেবে পর্যটন খাতে ধসের কথা উল্লেখ করেছে।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু পর্যটনেই সীমাবদ্ধ নয়। সংঘাতের কারণে মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে স্থানীয় ব্যবসা ও বাজারে ক্রেতা কমে যায়। অনেক পরিবার আয় হারানোর আশঙ্কায় ব্যয় কমিয়ে দেয়। ফলে দোকান, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ বিভিন্ন সেবাখাতে চাহিদা কমে যেতে পারে। একই সময়ে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে বাধা তৈরি হলে ব্যবসার খরচও বাড়ে। অর্থনীতির একদিকে চাহিদা কমে, অন্যদিকে উৎপাদন ও পরিবহনের ব্যয় বাড়ে—যা সংকটকে আরও গভীর করে।

লেবাননের জন্য মূল্যস্ফীতিও বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, পণ্য পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধি এবং তেলের দাম বাড়ার মতো কারণগুলো মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। যেসব পরিবার ইতোমধ্যে আয় কমে যাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের জন্য খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা, বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়া বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন জীবন চালাতে হতে পারে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের কারণে লেবাননে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। সংঘাতের এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হলে তাদের আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। ফলে বাস্তুচ্যুতি অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করে—একদিকে সরকারি ও মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়ে, অন্যদিকে উৎপাদনশীল মানুষের একটি অংশ স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

লেবাননের অর্থনৈতিক সংকটের আরেকটি বড় কেন্দ্র হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। ২০১৯ সালের আর্থিক সংকটের পর দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার ঘাটতি অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের ব্যাংকিং ও সরকারি অর্থব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন নিয়ে সম্প্রতি লেবাননের পার্লামেন্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং সমস্যা মোকাবিলার লক্ষ্যে ব্যাংক পুনর্গঠনসংক্রান্ত একটি আইনে সংশোধনী অনুমোদন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতকে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করার পথ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এই আইনগত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে লেবাননের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তবে আইন পাস করা এবং বাস্তবে তা কার্যকর করার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত সংস্কার করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিরতা প্রয়োজন হবে।

লেবানন বর্তমানে আইএমএফের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছে। দেশটির অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর জন্য বেশ কিছু কঠিন সংস্কার বাস্তবায়নের প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক দাহলিয়া খলিফা লেবাননের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এবং পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কারকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

লেবাননের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সময়ে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা। যুদ্ধ থামলেও অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, বাস্তুচ্যুত মানুষকে পুনর্বাসন, ব্যবসা পুনরায় চালু করা এবং পর্যটন খাতকে ফিরিয়ে আনতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে। আর যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সময় আরও বাড়তে পারে।

এই সংকটের মানবিক দিকও গভীর। অর্থনীতির সংকোচন মানে শুধু জিডিপির একটি সংখ্যা কমে যাওয়া নয়; এর প্রভাব মানুষের কর্মসংস্থান, আয়, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর পড়ে। যুদ্ধের কারণে যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন বা নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের কাছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার মানে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ। ব্যবসায়ীদের কাছে এর অর্থ দোকান ও কারখানা পুনরায় চালু করা, আর তরুণদের কাছে এর অর্থ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া।

লেবাননের অর্থনীতি তাই এখন এক ধরনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত ও সরকারি অর্থব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য কিছু সম্ভাবনা তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা, অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করতে পারলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।

তবে স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি সহজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ৬ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপি সংকোচন এবং ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেশটির অর্থনীতির সামনে থাকা কঠিন বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই সংঘাতের অবসানের পাশাপাশি দ্রুত পুনর্গঠন, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা লেবাননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার যে সম্ভাবনা লেবানন তৈরি করেছিল, যুদ্ধের নতুন ধাক্কায় তা আবারও বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফেরাতে হলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করলেই হবে না; মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে কার্যকর করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগও নিতে হবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তার পাশাপাশি লেবাননের নিজস্ব সংস্কার কার্যক্রম কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত