নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়িয়েছে ইরান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়িয়েছে ইরান

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বছরের পর বছর ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ ও নানা ধরনের বহিরাগত প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির নৌবাহিনীপ্রধান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে চলা চাপকে মোকাবিলা করে ইরান নিজস্ব প্রযুক্তি, অভ্যন্তরীণ জ্ঞান এবং জাতীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে প্রতিরক্ষা খাতকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা এখন দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের নৌবাহিনীপ্রধান এসব কথা বলেন। দেশটির বার্তা সংস্থা মেহরের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বক্তব্যে তিনি ইরানের প্রতিরক্ষা খাতের বিকাশের পেছনে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও বহিরাগত চাপের প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশটি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

ইরানের নৌবাহিনীপ্রধান বলেন, দেশটি এমন একটি পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে বিদেশি নির্ভরতার পরিবর্তে নিজস্ব জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জাতীয় ইচ্ছাশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এই ধারাবাহিকতার ফলেই ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।

ইরানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতার বিষয়টি বহু বছর ধরেই দেশটির নীতিনির্ধারণী অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে সামরিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা উপকরণ সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার পর নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর তেহরান জোর দিয়ে আসছে। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যেও বারবার স্থানীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে।

নৌবাহিনীপ্রধানের বক্তব্যেও সেই নীতির প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা এবং বহিরাগত চাপ ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নের পথে বাধা তৈরি করলেও দেশটি নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। তার দাবি, দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টার ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর দেশের নির্ভরতা বেড়েছে এবং একই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতাও শক্তিশালী হয়েছে।

তার বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বিভিন্ন সময়ে বেড়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি ও পরোক্ষ সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঘিরে বিরোধ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখাকে তেহরান জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।

ইরানের নৌবাহিনীপ্রধান দাবি করেন, দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার ভাষায়, সামরিক সক্ষমতার এই উন্নয়ন শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান শক্তিশালী করেনি, বরং ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাও বাড়িয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশটির প্রতিপক্ষদের পরিকল্পনা ও নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার মতে, নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার বিকাশ ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় দেশটির সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

তবে ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের এ ধরনের বক্তব্যকে দেশটির সরকারি অবস্থানের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে তেহরান নিয়মিতভাবে নিজেদের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন সক্ষমতা এবং পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার আলোচনায়ও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে দেশটির স্থানীয় প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করে থাকেন। সামরিক যান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌযান এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর তেহরান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ায় নিজস্ব গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও জোরালো হয়েছে।

নৌবাহিনীপ্রধানের বক্তব্যে জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে কেবল সামরিক সক্ষমতার বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার মতে, একটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যত বেশি নিজস্ব প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল হবে, বহিরাগত চাপের সময় দেশটির কৌশলগত স্বাধীনতাও তত বেশি বজায় থাকবে।

ইরানের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি আমদানি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতেও বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। তেহরানের বক্তব্য হলো, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই দেশটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদে সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়নেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থায় উন্নত ইলেকট্রনিকস, সেন্সর, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলে প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তবে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব বলছে, স্থানীয় গবেষণা ও উৎপাদনের মাধ্যমে এসব সীমাবদ্ধতা মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।

জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প দিবসে দেওয়া বক্তব্যে নৌবাহিনীপ্রধান মূলত সেই আত্মনির্ভরতার ধারাকেই তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ইরান ভবিষ্যতেও নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ধরে রাখতে চায়।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরানের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তেহরানের সামরিক সক্ষমতা শুধু দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের নিরাপত্তা হিসাবেও এর প্রভাব রয়েছে। ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিটি দাবি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ সংঘাতের সম্ভাবনার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

সব মিলিয়ে ইরানের নৌবাহিনীপ্রধানের বক্তব্য থেকে যে বার্তা পাওয়া যায় তা হলো, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও বহিরাগত চাপকে তেহরান প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ থামিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে দেখছে না। বরং নিজস্ব প্রযুক্তি, দক্ষতা ও জাতীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সামরিক শক্তি আরও বাড়ানোর পথেই এগোতে চায় দেশটি। তার দাবি অনুযায়ী, এই সক্ষমতাই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত