শ্রমবাজারমুখী উচ্চশিক্ষার তাগিদ অর্থমন্ত্রীর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
শ্রমবাজারমুখী উচ্চশিক্ষার তাগিদ অর্থমন্ত্রীর

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মতে, উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল একটি সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং চাইলে নিজেরাও উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সাভারের ব্র্যাক সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্টে ‘উপাচার্যদের সংলাপ: উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী জাতীয় সংলাপের প্রথম দিনে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও উচ্চশিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশের দীর্ঘদিনের আলোচনায় অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে একজন শিক্ষার্থী বাস্তব কর্মজীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছেন। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তর শেষ করে কর্মবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাঁদের একাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সামঞ্জস্য না থাকায় কর্মসংস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা গেছে।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নতুন বিভাগ বা নতুন বিষয় চালুর ক্ষেত্রেও দেশের অগ্রাধিকার খাত, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বিবেচনায় নেওয়া দরকার। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনীতি ও সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিকাশে কর্মক্ষেত্রের ধরনও বদলে যাচ্ছে। ফলে কয়েক বছর আগে যে দক্ষতার চাহিদা ছিল, ভবিষ্যতে তার সবগুলো একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাও থাকতে পারে। নতুন নতুন পেশা তৈরি হচ্ছে, আবার কিছু প্রচলিত কাজ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থমন্ত্রী উচ্চশিক্ষার সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কার্যকর সংযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সক্ষমতা সম্পর্কে শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবহিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে তৈরি জ্ঞান যেন কেবল গবেষণাপত্র বা একাডেমিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা বাস্তব অর্থনীতিতে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে—এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যাকে গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন খাতে উৎপাদন, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ কিংবা জ্বালানি নিয়ে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সেগুলোর সমাধানে কাজ করতে পারেন। এর ফলে গবেষণার সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির সংযোগ বাড়বে এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অর্থায়ন এবং গবেষণার ফল বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষণার ফল যদি নতুন পণ্য, সেবা, প্রযুক্তি কিংবা ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ নেয়, তাহলে এর সুফল শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৃহত্তর অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে একটি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। বরাদ্দের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মান, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের ফলাফলও নিশ্চিত করতে হবে।

এই বক্তব্যের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিয়ে ইউজিসির অবস্থানও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং তাঁদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

সংলাপে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবন, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইনোভেশন হাব, ইনকিউবেশন সেন্টার এবং সমন্বিত স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণা যেন শুধু প্রতিযোগিতা বা উপস্থাপনার মধ্যে আটকে না থাকে, বরং সরকারি অনুদান ও অর্থায়নের মাধ্যমে বাস্তব স্টার্টআপে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়—সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় শিল্পাঞ্চল, হাইটেক পার্ক বা অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকলেও স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর যোগাযোগ এখনও সব জায়গায় গড়ে ওঠেনি বলে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প খাতের মধ্যে এই দূরত্ব কমিয়ে একটি সমন্বিত সহযোগিতা কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের লাইসেন্সিং ও অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে নীতিগত সহায়তার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষার এই নতুন ভাবনায় বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার পরিবর্তে জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন তাঁর সামনে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার লক্ষ্য থাকে না; ভবিষ্যতে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও অর্থবহ কর্মজীবন গড়ে তোলার প্রত্যাশাও থাকে। সেই প্রত্যাশা পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা যদি কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্যই আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

তবে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সামঞ্জস্য তৈরির অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক জ্ঞান, মানবিক শিক্ষা বা মুক্তচিন্তার গুরুত্ব কমে যাবে। বরং ব্যবহারিক দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের বিকাশও উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন। ড. মাহ্দী আমিনও এমন শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে গ্র্যাজুয়েটরা দক্ষ পেশাজীবী হওয়ার পাশাপাশি নীতি, আদর্শ ও সামাজিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং দেশ-বিদেশের কর্মবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

দুই দিনব্যাপী এই জাতীয় সংলাপ দেশের প্রায় ৬৫টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নীতিনির্ধারক, দেশি-বিদেশি শিক্ষাবিদ এবং উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন। সংলাপে উচ্চশিক্ষার বর্তমান চ্যালেঞ্জ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হচ্ছে।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় শক্তি। এই শক্তিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাস্তব সংযোগ তৈরি করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে একজন তরুণ যদি নিজের অর্জিত জ্ঞানকে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন, নতুন উদ্যোগ নিতে পারেন কিংবা গবেষণার মাধ্যমে কোনো বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে পারেন, তাহলে উচ্চশিক্ষার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বহুগুণ বাড়বে।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য এবং জাতীয় সংলাপে উঠে আসা অন্যান্য প্রস্তাব সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ এখন শুধু কতজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং তারা কী শিখছেন, সেই জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারছেন এবং দেশের অর্থনীতি ও সমাজে কী ধরনের মূল্য তৈরি করতে পারছেন—সেটিই হবে বড় প্রশ্ন। শ্রমবাজারের পরিবর্তন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত