স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলকে সভাপতি নিয়ে অনিশ্চয়তা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলকে সভাপতি নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা না হওয়ায় আগামী অধিবেশনে গঠিত হতে যাওয়া ৩৫টি স্থায়ী কমিটির কোন কোনটির নেতৃত্ব বিরোধী দলের হাতে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি বিষয়ভিত্তিক এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। এখন পর্যন্ত ১৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক ছয়টি এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত নয়টি কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। বাকি কমিটিগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন সরকারি দল বা তাদের মিত্রদের সদস্যরা।

আগামী ২৭ আগস্ট থেকে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই অধিবেশনে বাকি ৩৫টি স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। তবে কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় বিষয়টি সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো আইন প্রণয়ন এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখা, বিভিন্ন বিল পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এসব কমিটির। ফলে শুধু কমিটি গঠন করাই নয়, এসব কমিটির নেতৃত্বে কারা থাকছেন, সেটিও সংসদের কার্যকর ভূমিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বীকৃত জুলাই সনদের প্রস্তাবে সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের একটি কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদও সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যার অনুপাতে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

জুলাই সনদের এই প্রস্তাবে বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট একমত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ওই সমঝোতার বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংসদে তাদের আসনসংখ্যার অনুপাতে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। দলটির একটি সূত্রের ভাষ্য, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার পর তারা আশা করেছিল, পরবর্তী ধাপে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্বও তাদের দেওয়া হবে। বিশেষ করে সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে প্রায় ১০টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল তাদের।

কিন্তু সরকারি দলের অবস্থান ভিন্ন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি যুক্ত রয়েছে। বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি না দেওয়ায় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের ক্ষেত্রেও আগের রীতি অনুসরণ করার কথা ভাবা হচ্ছে।

গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলকে ওই কমিটিতে পাঁচজন প্রতিনিধি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে তাদের সমর্থন রয়েছে, তবে কমিটি গঠনের পদ্ধতি নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।

সরকারি দলের বক্তব্য হলো, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল অংশ নিলে জুলাই সনদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথও এগিয়ে যাবে। তাদের যুক্তি, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়টিও ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে স্থায়ী কাঠামোর আওতায় আনা যেতে পারে।

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার জন্য এখনই সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য নয়। কারণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হবেন, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট করে বলা নেই। ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংসদীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে চাইলে বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই বিরোধী দলকে আরও কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

সংসদের কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, সংসদে গৃহীত প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নিয়োগ পান। সংসদ কোনো সদস্যকে মনোনীত না করলে কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচন করতে পারেন। তবে বাস্তবে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সংসদে কমিটি গঠনের প্রস্তাব সাধারণত সরকারি দলের পক্ষ থেকেই আসে এবং তা পাস হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

চলতি সংসদে এখন পর্যন্ত গঠিত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত নয়টি কমিটির সভাপতিই সরকারি দল বা মিত্রদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এসব কমিটির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, পানিসম্পদ, শিল্প, পরিকল্পনা, অর্থ এবং আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি রয়েছে।

বিষয়ভিত্তিক ছয়টি কমিটির মধ্যে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। অন্য কমিটিগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন সরকারি দল বা সংশ্লিষ্ট জোটের সদস্যরা।

এর আগে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও বিরোধী দলকে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। একাদশ সংসদে যোগাযোগ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বও বিরোধী দলের সদস্যরা পালন করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও সরকারি হিসাব কমিটির নেতৃত্ব বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।

সংসদ সচিবালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্থায়ী কমিটি গঠনের আগে সাধারণত সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। কোন কমিটিতে কোন দলের কতজন সদস্য থাকবেন এবং বিরোধী দলের কোন সদস্য কোন কমিটিতে থাকবেন—এসব বিষয়েও আলোচনা করা হয়ে থাকে। তবে এবার সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বিরোধী দলের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান মোমেনের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংসদীয় কমিটির সদস্য মনোনয়নের জন্য বিরোধী দলের কাছে নাম চাওয়া হয়েছিল। তখন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ অনুযায়ী আসনসংখ্যার অনুপাতে সভাপতি পদ দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল অংশ না নিলে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে না।

এ অবস্থায় আগামী অধিবেশনে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক আলোচনা আরও বাড়তে পারে। কারণ সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু বিতর্ক বা বক্তব্যের সুযোগ নয়, সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে তাদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনার ক্ষমতা থাকা কমিটিতে বিরোধী দলের সভাপতিত্ব সরকারের জবাবদিহি বাড়াতে পারে বলে মনে করেন সংসদীয় রাজনীতি পর্যবেক্ষকেরা।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজও সংসদীয় কমিটিগুলো দ্রুত গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার স্বার্থে এসব কমিটি কার্যকর হওয়া জরুরি। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী চারটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির ক্ষেত্রেও আসনসংখ্যার ভিত্তিতে বিরোধী দলের অংশীদারত্ব থাকার কথা।

এদিকে কমিটি গঠনের আরেকটি বাস্তব দিকও সামনে এসেছে। ইতোমধ্যে পরিকল্পনা এবং আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা আবদুল মঈন খান ও আন্দালিভ রহমান পার্থ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ফলে তাঁদের নেতৃত্বাধীন সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোও পুনর্গঠন করতে হবে।

সব মিলিয়ে আগামী অধিবেশনে জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটি গঠন শুধু একটি প্রশাসনিক বা সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি সরকারের জবাবদিহি, বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

সরকারি দল অতীতের রীতি অনুসরণ করবে, নাকি জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী দলকে আরও বেশি কমিটির নেতৃত্বে জায়গা দেবে—এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী অধিবেশনে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধী দলের প্রত্যাশা এবং সরকারি দলের অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব আরও স্পষ্ট হতে পারে। আর সেই সিদ্ধান্ত সংসদে সরকারের জবাবদিহির কাঠামো কতটা শক্তিশালী হবে, তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত