পররাষ্ট্র উপদেষ্টা থেকে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা থেকে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেট-২ আসন ও জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন ওসমানীনগরের কৃতী সন্তান হুমায়ুন কবির। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের পর মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে হুমায়ুন কবিরও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার এই নতুন দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সিলেট-২ আসনের রাজনীতিতে যেমন নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, তেমনি জাতীয় রাজনীতিতেও তার রাজনৈতিক উত্থান নতুন মাত্রা পেয়েছে।

হুমায়ুন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সিলেটের ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথসহ বিভিন্ন এলাকায় তার অনুসারী ও সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। কোথাও আনন্দ মিছিল, কোথাও মিষ্টি বিতরণ এবং বিভিন্নভাবে আনন্দ প্রকাশ করেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন পর সিলেট-২ আসনের একজন বিএনপি নেতা সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

স্বাধীনতার পর সিলেট-২ আসন থেকে বিএনপির কোনো নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। হুমায়ুন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। এর আগে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী মন্ত্রিত্ব লাভ করেছিলেন। এছাড়া ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শফিকুর রহমান চৌধুরী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

হুমায়ুন কবিরের শেকড় সিলেটের ওসমানীনগরে। প্রবাসী অধ্যুষিত এই উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের হাবসপুর গ্রামের সন্তান তিনি। শৈশবেই যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান হুমায়ুন কবির। সেখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। যুক্তরাজ্যের সাসেক্স, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, কেমব্রিজ ও লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। উচ্চশিক্ষার কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে।

পেশাগত জীবনেও যুক্তরাজ্যের সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হুমায়ুন কবির। ব্রিটিশ কেবিনেট অফিসে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও ঋষি সুনাকের সময়ে তিনি কেবিনেট অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে প্রশাসনিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সরকারি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান তিনি।

যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে বিএনপির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন হুমায়ুন কবির। দলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগও তার হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নভেম্বর মাসে দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন হুমায়ুন কবির। দেশে ফেরার পর সিলেট-২ আসনকে কেন্দ্র করে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও দৃশ্যমান হয়। তিনি ওই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবেও মাঠে সক্রিয় ছিলেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য রেখে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক-বিষয়ক) পদে দায়িত্ব পান।

দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কর্মকাণ্ডে দায়িত্ব পাওয়ার পর হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। বিদেশে দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রশাসনের অভিজ্ঞতার কারণে বিএনপির আন্তর্জাতিক যোগাযোগে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে ঘিরে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির আলোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার সরাসরি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। বিশেষ করে পররাষ্ট্রসংক্রান্ত বিষয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে নতুন দায়িত্বে তার ওপর বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বৈদেশিক নীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সিলেটের স্থানীয় মানুষের আবেগও জড়িয়ে রয়েছে। ওসমানীনগরের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়া, সেখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, ব্রিটিশ প্রশাসনে কাজ করা এবং পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছানো—তার জীবনপথ স্থানীয়ভাবে অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার প্রতিমন্ত্রী হওয়ার খবরে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা গেছে।

শুক্রবারের শপথ অনুষ্ঠানে হুমায়ুন কবির ছাড়াও মন্ত্রিসভায় আরও কয়েকজন নতুন সদস্য যুক্ত হন। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ও সাচিং প্রু জেরী। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। নতুন দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক পথচলায় যুক্ত হলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সিলেট-২ আসন থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসা হুমায়ুন কবিরের সামনে এখন বড় দায়িত্ব। উপদেষ্টা হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই হবে তার জন্য পরবর্তী বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরা এবং দেশের সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কতটা কাজে আসে, তা এখন দেখার বিষয়।

একই সঙ্গে সিলেট-২ আসনের মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক সমর্থকদের আশা, জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পর হুমায়ুন কবির এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের স্বার্থেও ভূমিকা রাখবেন। তবে তার রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ইতোমধ্যে ঘটে গেছে—উপদেষ্টার দায়িত্ব পেরিয়ে তিনি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য।

ওসমানীনগরের মাটি থেকে শুরু হওয়া হুমায়ুন কবিরের এই দীর্ঘ পথচলায় শুক্রবারের শপথ অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে নতুন দায়িত্বে তিনি কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, এখন সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল ও সিলেটের মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত