প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জয়পুরহাটের পুরানাপুল এলাকায় চিলাহাটি থেকে রাজশাহীগামী আন্তঃনগর বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি কোচের কয়েল স্প্রিং ভেঙে যাওয়ায় ট্রেনটি রেললাইনের ওপর বিকল হয়ে পড়েছে। শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে এ ঘটনা ঘটে। আকস্মিক এই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীবাহী ট্রেন আটকা পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
স্থানীয় ও রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সকালে নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে আসে আন্তঃনগর বরেন্দ্র এক্সপ্রেস। ট্রেনটি জয়পুরহাটের পুরানাপুল রেলগেট এলাকা অতিক্রম করার পরপরই একটি যাত্রীবাহী কোচের কয়েল স্প্রিং ভেঙে যায়। স্প্রিংটি ভেঙে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কোচের একটি অংশ নিচের দিকে নেমে আসে। ফলে ট্রেনটি আর স্বাভাবিকভাবে এগোতে পারেনি এবং রেললাইনের ওপর আটকে যায়।
ঘটনার সময় ট্রেনে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ছিলেন। হঠাৎ ট্রেন থেমে যাওয়ায় অনেকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে ট্রেনের চালক ও পরিচালকের দ্রুত তৎপরতার কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যান্ত্রিক ত্রুটিটি দ্রুত শনাক্ত করতে পারায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়। এতে শত শত যাত্রী সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের পরিচালক আনোয়ার হোসেন জানান, যাত্রীবাহী একটি কোচের স্প্রিং ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি দ্রুত বুঝতে পারেন তারা। বিষয়টি টের পাওয়ার পর ট্রেন থামিয়ে দেওয়া হয়। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ট্রেনটি স্বাভাবিকভাবে চলতে না পারায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের মতো আন্তঃনগর ট্রেন উত্তরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চিলাহাটি, পার্বতীপুর, জয়পুরহাট, সান্তাহার হয়ে রাজশাহীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে এই রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কর্মস্থল, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে এই ট্রেন ও সংশ্লিষ্ট রেলপথ ব্যবহার করেন। ফলে মাঝপথে একটি ট্রেন বিকল হয়ে পড়ার প্রভাব শুধু ওই ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে।
বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের বিকলের পর পার্বতীপুর, সান্তাহার, রাজশাহী ও ঢাকামুখী রুটে ট্রেন চলাচলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। একক রেলপথের কারণে একটি ট্রেন দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে পেছন থেকে আসা এবং বিপরীত দিক থেকে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক যাত্রাও ব্যাহত হয়। ফলে বিভিন্ন স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়তে থাকে।
সকালের যাত্রায় অনেক যাত্রী নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করে ট্রেনে উঠেছিলেন। কেউ যাচ্ছিলেন কর্মস্থলে, কেউ ব্যবসায়িক কাজে, আবার কেউ চিকিৎসা বা পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে। কিন্তু মাঝপথে ট্রেন বিকল হয়ে যাওয়ায় তাদের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য এমন পরিস্থিতি বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ট্রেন কখন সচল হবে, কখন গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবে—তা নিশ্চিত না হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের বিকলের খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধারকারী ট্রেন বা রিলিফ ট্রেন পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঘটনার পরপরই পার্বতীপুর ও সান্তাহার জংশন স্টেশনে খবর দেওয়া হয়। পরে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের পরিচালক।
তবে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিকল কোচের কীভাবে ব্যবস্থা করবে এবং পুরো উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ট্রেনটি কখন আবার চলাচল শুরু করবে এবং উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ কখন স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রেলপথে একটি কোচের যান্ত্রিক ত্রুটি কীভাবে বড় ধরনের যোগাযোগ সংকট তৈরি করতে পারে, এ ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ। বিশেষ করে একক লাইনের রেলপথে একটি ট্রেন দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে পেছনের ট্রেনগুলোকে বিভিন্ন স্টেশনে থামিয়ে রাখতে হয়। এতে একদিকে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়ে, অন্যদিকে পুরো রেলওয়ে সময়সূচিতে বিলম্ব তৈরি হয়। একটি ট্রেনের সমস্যার প্রভাব তখন একাধিক ট্রেন ও হাজারো যাত্রীর ওপর গিয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রতিটি কোচের যান্ত্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোচের স্প্রিং, চাকা, ব্রেক বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি দেখা দিলে সেটি চলাচলের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নির্ধারণের পরই ট্রেন পরিচালনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘপথের আন্তঃনগর ট্রেনের ক্ষেত্রে নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের ঘটনাতেও বড় দুর্ঘটনা না ঘটায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে একই সঙ্গে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ট্রেনের কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি যাত্রীবাহী কোচের স্প্রিং ভেঙে ট্রেন রেললাইনে আটকে যাওয়ার ঘটনা যাত্রীসেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
এদিকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিকল বরেন্দ্র এক্সপ্রেসকে সরিয়ে নেওয়ার পর রেলপথে আটকে থাকা অন্যান্য ট্রেন পর্যায়ক্রমে চলাচল শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য রেল যোগাযোগ শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই একটি আন্তঃনগর ট্রেন বিকল হয়ে দীর্ঘ সময় রেলপথ আটকে থাকলে এর প্রভাব কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চিকিৎসাপ্রত্যাশী—সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ে। বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, যাত্রী নিরাপত্তার পাশাপাশি ট্রেনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
রেল কর্তৃপক্ষের দ্রুত তৎপরতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও যাত্রীদের স্বাভাবিক যাত্রা নিশ্চিত করতে এখন মূল গুরুত্ব হচ্ছে বিকল ট্রেনটি দ্রুত সরিয়ে রেলপথ উন্মুক্ত করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি কমাতে কোচগুলোর কারিগরি পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ আরও কার্যকর করার দাবি উঠছে। উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথে দ্রুত ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে—এমন প্রত্যাশায় এখন অপেক্ষায় রয়েছেন আটকে পড়া যাত্রীরা।