স্টার্কের তোপে ৬৪ রানে অলআউট বাংলাদেশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
স্টার্কের তোপে ৬৪ রানে অলআউট বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে ম্যাকাইয়ে দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। ডারউইনে প্রথম টেস্টে ঐতিহাসিক জয় পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসী হয়েই দ্বিতীয় ম্যাচে নামার কথা ছিল নাজমুল হোসেন শান্তদের। কিন্তু টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামার পর শুরু থেকেই যে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে, তা শেষ পর্যন্ত রীতিমতো দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।

বাংলাদেশের এই স্কোর টেস্ট ক্রিকেটে দলের চতুর্থ সর্বনিম্ন ইনিংস। এমনকি ইনিংসের শুরুতে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করা বাংলাদেশের ৪৩ রানের সর্বনিম্ন টেস্ট স্কোরের রেকর্ডটি আবারও সামনে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত সেই লজ্জাজনক রেকর্ড ভাঙেনি বাংলাদেশ। তবে ৬৪ রানে অলআউট হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত কঠিন করে ফেলেছে তারা।

ম্যাচের শুরুতেই বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান স্টার্ক। দলীয় স্কোর ১২ রান ছোঁয়ার আগেই বাংলাদেশের পাঁচটি উইকেট তুলে নেন এই অভিজ্ঞ পেসার। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, পাঁচটি উইকেট পেতে তাঁর প্রয়োজন হয়েছে মাত্র ২২ বল। নতুন বলে গতি, সুইং এবং সঠিক লেংথের সমন্বয়ে বাংলাদেশের ব্যাটারদের একের পর এক সমস্যায় ফেলেন তিনি। শুরুতেই তাঁর বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশ যে চাপে পড়ে, সেখান থেকে আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়নি।

স্টার্কের আক্রমণের শুরুটাও ছিল নাটকীয়। বাংলাদেশের ইনিংসের প্রথম বলেই শাদমান ইসলামকে ক্যামেরন গ্রিনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরান তিনি। এরপর আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেন। তানজিদ হাসানকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকেও বেশিক্ষণ টিকতে দেননি। এরপর মুমিনুল হক ও লিটন দাসকে ফেরানোর মধ্য দিয়ে মাত্র ২২ বলেই পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। বাংলাদেশের টপ অর্ডারের এমন ধস ম্যাচের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।

ইনিংসে মোট ছয় উইকেট নিয়েছেন স্টার্ক। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তাঁর ১৯তম পাঁচ উইকেটের কীর্তি। তবে শুধু পরিসংখ্যানের দিক থেকেই নয়, বোলিংয়ের ধরন এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায়ও এই স্পেলকে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম সেশনেই ছয় উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়াকে দারুণ অবস্থানে নিয়ে যান।

স্টার্কের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সাক্ষী ছিলেন তাঁর স্ত্রী এলিসা হিলি। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উইকেটরক্ষক ও ব্যাটার হিলি বর্তমানে ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করছেন। ম্যাকাই টেস্টে কমবক্সে বসেই স্বামীর বিধ্বংসী বোলিং দেখছিলেন তিনি। স্টার্কের দুর্দান্ত স্পেল শেষ হওয়ার পর ম্যাচের মাঝপথেই তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পান হিলি। স্বামীর কাছ থেকে এমন অসাধারণ পারফরম্যান্সের ব্যাখ্যা নেওয়ার মুহূর্তটি তাই ছিল অন্যরকম।

সাক্ষাৎকারে স্টার্ক জানান, ম্যাচের শুরুতে বোলিং করার সুযোগ পাওয়া অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় সুবিধা ছিল। তাঁর মতে, ম্যাকাইয়ের উইকেটে শুরুর দিকে পেসারদের জন্য যে সহায়তা ছিল, সেটি কাজে লাগানোই ছিল মূল লক্ষ্য। স্থানীয় কয়েকজন খেলোয়াড় উইকেটটিকে গাবার মতো বলে মন্তব্য করেছিলেন বলেও জানান তিনি। সেই কারণে প্রথম সেশনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল অস্ট্রেলিয়া।

বাংলাদেশের বিপক্ষে ছয় উইকেট পাওয়ার পর নিজের বোলিং নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও স্টার্কের কথায় ছিল পরিকল্পনার বিষয়টিও। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শুধু গতি দিয়ে নয়, পরিস্থিতি বুঝে লেংথ নির্ধারণ করাই ছিল সাফল্যের অন্যতম কারণ। প্রথম সেশনেই ছয়টি উইকেট তুলে নিতে পারায় অস্ট্রেলিয়া যে স্বস্তি পেয়েছে, তাঁর কথাতেও সেটি স্পষ্ট ছিল।

ডারউইনে প্রথম টেস্টের পর বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার বোলিং পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন স্টার্ক। তাঁর মতে, প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটাররা ধৈর্য ধরে ভালো ব্যাটিং করেছিলেন। সে কারণে দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের লেংথ কিছুটা সামনে রাখতে হতো। পাশাপাশি বাউন্সারের ব্যবহার বাড়ানো এবং ক্যাচের সুযোগগুলো ঠিকভাবে কাজে লাগানোও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানান তিনি।

প্রথম টেস্টের সঙ্গে দ্বিতীয় টেস্টের পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ডারউইনে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে তাদের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় তুলে নিয়েছিল। সেই ম্যাচে বাংলাদেশের বোলার ও ব্যাটাররা দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে রাখার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল।

তাই দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের কাছ থেকে অনেক বেশি প্রতিরোধের প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ম্যাকাইয়ে সিরিজ জয়ের সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজ জিতে গেলে সেটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাফল্য হয়ে থাকত। কিন্তু স্টার্কের অসাধারণ বোলিং সেই স্বপ্নে প্রথম দিনেই বড় ধাক্কা দিয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে একমাত্র কিছুটা প্রতিরোধ এসেছে ইনিংসের শেষ দিকে। নিচের সারির ব্যাটারদের চেষ্টা দলকে ৬৪ রানে পৌঁছাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে শেষ উইকেটে শোরিফুল ইসলাম ও তাইজুল ইসলামের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসকে কিছুটা সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যায়। শোরিফুল ১৪ রান করেন এবং তাইজুল অপরাজিত থাকেন ১১ রানে। তাঁদের লড়াইয়ের কারণেই বাংলাদেশ ৪৩ রানে গুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়।

তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল হতাশাজনক। নতুন বলের সামান্য সুইং ও বাউন্সের সামনে ব্যাটারদের টেকনিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে একাধিক দুর্বলতা দেখা যায়। স্টার্কের বলের গতি সামলাতে গিয়ে অনেকেই ভুল শট খেলেছেন। কেউ কেউ অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে বিপদ ডেকে এনেছেন। ফলে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণকে বড় কোনো পরীক্ষা দিতে পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার।

৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর বাংলাদেশের জন্য ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র পথ ছিল দ্রুত অস্ট্রেলিয়ার উইকেট তুলে নেওয়া। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে বড় ব্যবধান তৈরি হয়ে গেলে তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। বাংলাদেশের বোলারদের সামনে তাই ছিল কঠিন দায়িত্ব। ব্যাটিং ব্যর্থতার পর অন্তত বল হাতে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলতে না পারলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্বাগতিকদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, প্রথম টেস্টে যে ব্যাটিং শৃঙ্খলা ও ধৈর্য দেখা গিয়েছিল, দ্বিতীয় টেস্টের শুরুতে তার কোনো ছাপ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া প্রথম টেস্টের পর নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে মাঠে নামে। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা গেছে স্টার্কের বোলিংয়ে।

একটি টেস্ট ম্যাচের শুরুতে মাত্র কয়েক ওভারের মধ্যে পাঁচ উইকেট হারানো যেকোনো দলের জন্যই বড় ধাক্কা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। ডারউইনের ঐতিহাসিক জয়ের পর ম্যাকাইয়ে সিরিজ জয়ের যে স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল দল, স্টার্কের আগুনঝরা স্পেল সেই স্বপ্নকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। ম্যাচের বাকি অংশে বাংলাদেশ কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

স্টার্কের জন্য অবশ্য দিনটি হয়ে থাকবে বিশেষ স্মৃতির। নিজের অসাধারণ বোলিংয়ের পর স্ত্রী এলিসা হিলির সঙ্গে মাঠেই সেই মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া তাঁর পারফরম্যান্সকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে। একদিকে স্বামীর সাফল্যের সাক্ষী ধারাভাষ্যকার স্ত্রী, অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য ভয়ংকর এক সকাল—ম্যাকাইয়ের এই টেস্টের শুরুতেই ক্রিকেটের দুই ভিন্ন অনুভূতি যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত