প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরনে সাম্প্রতিক সময়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কঠোর, পরিমিত ও আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক উপস্থিতির জন্য পরিচিত এই নেতা এখন তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ইনস্টাগ্রাম রিল, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও এবং তুলনামূলকভাবে অনানুষ্ঠানিক কনটেন্টে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তরুণদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর ভারতের রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় আসার মধ্যেই মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টির এই কৌশল পরিবর্তনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একসময় মোদির রাজনৈতিক ইমেজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি। পূর্বনির্ধারিত বক্তব্য, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, সুচিন্তিত রাজনৈতিক বার্তা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক ও আচরণের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে একজন শক্তিশালী ও কর্তৃত্বপূর্ণ নেতার ভাবমূর্তি ধরে রেখেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিচিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে তরুণদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডে।
ইনস্টাগ্রামে মোদির সাম্প্রতিক ভিডিওগুলোর কিছুতে তাঁকে তুলনামূলক স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও বাইক জ্যাকেট ও সানগ্লাসে, কোথাও জনপ্রিয় গানের সঙ্গে সম্পাদিত ভিডিওতে, আবার কোথাও তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। এমনকি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে তরুণদের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানানোও তাঁর সাম্প্রতিক ডিজিটাল কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে ভারতের তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব একটি বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। দেশটির জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় জেন জি প্রজন্মের ভোটারদের সংখ্যা ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা এখন কেবল প্রচারণার বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।
জেন জি মূলত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বোঝায়। এই প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের ধরন আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। প্রচলিত সভা, পোস্টার বা দীর্ঘ রাজনৈতিক বক্তৃতার পাশাপাশি তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ভিডিও, মিম, লাইভস্ট্রিম ও ব্যক্তিগত কনটেন্টের মাধ্যমে তথ্য গ্রহণ করে। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের জন্যও এই প্ল্যাটফর্মে নিজেদের উপস্থাপনের ধরন বদলানোর চাপ তৈরি হয়েছে।
মোদির ইনস্টাগ্রাম উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। এই প্ল্যাটফর্মে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এক কোটির অনেক ওপরে। ফলে ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ডিজিটালভাবে তাঁর উপস্থিতি আগে থেকেই শক্তিশালী। তবে সাম্প্রতিক পরিবর্তনটি অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে যোগাযোগের ধরন পরিবর্তনের দিকে বেশি মনোযোগী বলে মনে হচ্ছে। আগে যেখানে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের নির্বাচিত ছবি বা ভিডিও বেশি দেখা যেত, এখন সেখানে ব্যক্তিগত আবহ তৈরি করে এমন কনটেন্টের পরিমাণও বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক যুব আন্দোলনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। আন্দোলনটি মিম, লাইভস্ট্রিম ও ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আন্দোলনটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো উপলব্ধি করেছে যে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রচলিত রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি তাদের ব্যবহৃত ডিজিটাল ভাষাও বোঝা প্রয়োজন।
ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় থেকেই দলটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ফেসবুক, এক্স এবং হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক সমর্থক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে দলটি রাজনৈতিক বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা তৈরি করেছে। তবে ইনস্টাগ্রামের প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় সেখানে একই কৌশল সরাসরি কার্যকর নাও হতে পারে।
ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম সাধারণত ব্যবহারকারীর আগ্রহ, ভিডিও দেখার সময়, পুনরায় দেখা, শেয়ার ও মন্তব্যের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। ফলে দীর্ঘ রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে সংক্ষিপ্ত, আকর্ষণীয় এবং ব্যক্তিগত আবহের ভিডিও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। রাজনৈতিক নেতাদের জন্য এটি একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কারণ এখানে শুধু বার্তা প্রচার করলেই হয় না, দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার মতো উপস্থাপনও প্রয়োজন।
মোদির সাম্প্রতিক কিছু ভিডিও নিয়ে তরুণদের প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। একদিকে কিছু ব্যবহারকারী তাঁর নতুন উপস্থাপনা নিয়ে রসিকতা করেছেন, ভিডিওর ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও সম্পাদনা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন এবং তাঁর কথাবার্তার কিছু অংশ নিয়ে মিম তৈরি করেছেন। অন্যদিকে কিছু তরুণ এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। তাঁদের কাছে একজন দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতার তুলনামূলক অনানুষ্ঠানিক উপস্থিতি আগ্রহ তৈরি করেছে।
রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সমালোচনাও কখনো কখনো প্রচারের অংশ হয়ে যায়। কোনো ভিডিও নিয়ে ব্যঙ্গ, মিম বা বিতর্ক তৈরি হলে সেটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। ফলে রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও কখনো কখনো দৃশ্যমানতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বেশি ভিউ বা শেয়ার সরাসরি ভোটে সমর্থনে পরিণত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ তাই মোদির নতুন ইনস্টাগ্রাম কৌশলকে সতর্কতার সঙ্গে দেখছেন। তাঁদের মতে, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেই রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত হয় না। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে নির্বাচনী ফলাফলের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংগঠন, প্রার্থী নির্বাচন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুর ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন স্তরে দলটির কর্মী ও সমর্থকদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন কৌশলকে সেই সাংগঠনিক কাঠামোর পরিপূরক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তরুণদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ তৈরি করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক উপস্থিতি ধরে রাখাও দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
তবে তরুণ ভোটারদের মনোভাব যে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তা স্পষ্ট করেছে। নতুন প্রজন্ম শুধু রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য শুনতে চায় না; তারা নেতার ব্যক্তিত্ব, আচরণ, জীবনযাপন এবং সমসাময়িক সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও দেখতে চায়। ফলে রাজনীতিবিদদের সামনে এখন একটি নতুন প্রশ্ন—কীভাবে একজন রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদা বজায় রেখেও তরুণদের কাছে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্যভাবে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়।
মোদির ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় অংশই তৈরি হয়েছে শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে কেন্দ্র করে। হঠাৎ অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক হয়ে গেলে সেটি তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আবার তরুণদের ডিজিটাল সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকলেও নতুন ভোটারদের একটি অংশের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক কনটেন্টে শক্তিশালী নেতার পরিচিত ভাবমূর্তি এবং তরুণবান্ধব ব্যক্তিগত উপস্থিতির মধ্যে একটি সমন্বয় তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
এই পরিবর্তন শুধু মোদির ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। বিজেপির বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও তরুণদের উপযোগী কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও, জনপ্রিয় সংস্কৃতির উপাদান, সহজ ভাষা এবং দ্রুত গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তার উত্তর এখনই পাওয়া সম্ভব নয়। তরুণরা কোনো রাজনৈতিক নেতার ভিডিও দেখলেই যে তাঁকে ভোট দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং তারা একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, সংবাদ, ব্যঙ্গ এবং সমালোচনা গ্রহণ করে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমানতা অর্জনের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের রাজনীতিতে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব যত বাড়বে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক ব্যবহারও তত পরিবর্তিত হবে। মোদির সাম্প্রতিক রিলভিত্তিক উপস্থিতি সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়কের পরিচিত ইমেজের সঙ্গে তরুণদের ডিজিটাল সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি কতটা নতুন ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের আগামী দিনের নির্বাচনী রাজনীতিতে তরুণদের মনোযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে উপেক্ষা করে কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে না।