অর্থবছর বদল: লাভের আগে ঝুঁকির হিসাব জরুরি

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অর্থবছর ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত পরিচালিত হয়ে আসছে। এখন অর্থবছর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্তের আলোচনা সামনে এসেছে। এটি নিছক একটি তারিখ পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, হিসাবরক্ষণ, অডিট, কর নির্ধারণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। ফলে এমন মৌলিক পরিবর্তনের আগে এর সম্ভাব্য লাভ, ব্যয় ও ঝুঁকি নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।

সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটসংক্রান্ত নথিপত্রেও বর্তমান অর্থবছর কাঠামোকে ভিত্তি করে বাজেট প্রণয়ন ও মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে অর্থবছরের কাঠামো পরিবর্তন মানে শুধু পরবর্তী বাজেটের সময়সূচি বদলে দেওয়া নয়; বরং বিদ্যমান আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস।

অর্থবছর পরিবর্তনের পেছনে যদি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক যুক্তি থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অর্থবছর শুরু ও শেষ হয়। কোনো দেশের জন্য কোন সময় সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে রাজস্ব আহরণের সময়সূচি, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের মৌসুম, সরকারি ব্যয়ের ধরন, বৈদেশিক বাণিজ্য, ব্যবসায়িক হিসাবচক্র এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর। তাই অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার জন্য শুধু অর্থবছর পরিবর্তন করাই যথেষ্ট যুক্তি হতে পারে না।

বর্তমান ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণ করে বাজেট প্রাক্কলন, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করে। অর্থবছরের সময় পরিবর্তন হলে বাজেট প্রণয়ন, সংশোধিত বাজেট, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং উন্নয়ন বাজেটের সময়সূচিও নতুন করে সাজাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট বাজেট ব্যয়ের বাস্তবায়ন ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ এবং এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই যখন উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তখন হঠাৎ অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করলে প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিকল্পনা, দরপত্র, অর্থ ছাড় এবং বাস্তবায়নের সময়সূচির সঙ্গে নতুন অর্থবছরের সমন্বয় করাও জরুরি হবে।

অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে করবর্ষ ও রাজস্ব প্রশাসনের সম্পর্কও গভীর। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট, কাস্টমস, উৎসে কর, অগ্রিম কর, কর রিটার্ন এবং কর নিরীক্ষার সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এসব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে গিয়ে করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসন—উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

ব্যবসায়িক হিসাবচক্রের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ কোম্পানি ৩০ জুন বা ৩১ ডিসেম্বর তারিখে তাদের আর্থিক হিসাব বন্ধ করে থাকে। সরকারি অর্থবছর ৩১ মার্চে শেষ হলে রাষ্ট্রের অর্থবছর এবং কোম্পানির আর্থিক বছরের মধ্যে নতুন ধরনের সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কোম্পানিগুলোকে কি ৩১ মার্চে হিসাব বছর শেষ করতে বাধ্য করা হবে, নাকি তারা নিজেদের প্রচলিত অ্যাকাউন্টিং ইয়ার বজায় রাখবে? যদি কোম্পানিগুলোকে নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হয়, তাহলে হিসাবরক্ষণ, অডিট, কর রিটার্ন ও অন্যান্য কমপ্লায়েন্সের ব্যয় বাড়তে পারে। আবার সরকারি ও বেসরকারি খাতের আর্থিক তথ্য তুলনা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো প্রয়োজন হবে।

অর্থবছর পরিবর্তনের ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। জিডিপি হিসাব, রাজস্ব আয়, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন ব্যয়, ঘাটতি, ঋণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের তথ্য নতুন অর্থবছরের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। অতীতের তথ্যের সঙ্গে নতুন সময়সীমার তথ্য তুলনা করার ক্ষেত্রেও একটি রূপান্তরকাল প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে অর্থবছর পরিবর্তনের কিছু সম্ভাব্য সুবিধাও থাকতে পারে। সরকার যদি দেখাতে পারে যে নতুন সময়সূচি রাজস্ব আহরণ, বাজেট বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাস্তব সুবিধা তৈরি করবে, তাহলে পরিবর্তনের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুবিধা অবশ্যই পরিমাপযোগ্য হতে হবে। সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি রূপান্তরের খরচ ও প্রশাসনিক ঝুঁকিও হিসাব করতে হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব আহরণের চাপ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমেয়তা ও দক্ষতা বাড়ানোই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া অর্থবছরের মতো একটি মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের বদলে প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

তাই অর্থবছর পরিবর্তনের বিরোধিতা নয়, বরং পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তোলা জরুরি। কেন পরিবর্তন করা হচ্ছে, এর অর্থনৈতিক লাভ কী, রূপান্তরের ব্যয় কত, সম্ভাব্য ঝুঁকি কী এবং সেই ঝুঁকির বোঝা কে বহন করবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন।

সরকার অর্থবছর পরিবর্তন করতে চাইলে জনগণ, ব্যবসায়ী সমাজ, অর্থনীতিবিদ, হিসাব ও কর পেশাজীবীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ উপস্থাপন করতে পারে। বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সুবিধা, রূপান্তরের সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

অর্থবছর একটি রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ভিত্তি। তাই এর পরিবর্তন ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ সরানোর মতো সহজ বিষয় নয়। সিদ্ধান্তটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর পেছনে থাকবে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক যুক্তি, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত