যুদ্ধকালে নির্বাচন ইউক্রেনকে ধ্বংস করবে: জেলেনস্কি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার
যুদ্ধকালে নির্বাচন ইউক্রেনকে ধ্বংস করবে: জেলেনস্কি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করা হলে তা দেশটিকে গভীরভাবে বিভক্ত করে শেষ পর্যন্ত ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর মতে, যুদ্ধ চলাকালে ভোট আয়োজনের ফলে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র হতে পারে এবং তা ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।

রোববার সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে জেলেনস্কি যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিতর্কে প্রথমবারের মতো সরাসরি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর মন্তব্য আসে দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের যুদ্ধ চলাকালীন নির্বাচন আয়োজনের আহ্বানের কয়েক দিন পর। ফেদোরভের এই আহ্বান ইউক্রেনের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং যুদ্ধের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন করা হলে তা দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভক্ত করতে পারে। তাঁর ভাষায়, ইউক্রেনকে ধ্বংস করতে চাইলে এমন যুদ্ধের মধ্যেই নির্বাচনের দিকে এগোনো যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তাঁর কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখা।

ইউক্রেনের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করার পর দেশটিতে সামরিক আইন জারি রয়েছে। এই আইনের অধীনে নির্বাচন আয়োজন নিষিদ্ধ। ফলে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশটির স্বাভাবিক নির্বাচনী কার্যক্রম চালু করার সুযোগ নেই। যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন আয়োজনের জন্য আইনগত কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নানা জটিলতারও সমাধান করতে হবে।

শুধু আইনগত বাধাই নয়, বাস্তব পরিস্থিতিও নির্বাচন আয়োজনকে কঠিন করে তুলেছে। ইউক্রেনের লাখ লাখ নাগরিক যুদ্ধের কারণে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অনেকে আবার রুশ বাহিনীর দখলে থাকা এলাকায় বসবাস করছেন। বিপুলসংখ্যক সামরিক সদস্য সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে নিয়োজিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ হামলার ঝুঁকিও অব্যাহত রয়েছে। ফলে একটি অবাধ, নিরাপদ ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচন আয়োজন করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

নির্বাচন নিয়ে বিতর্কটি নতুন করে সামনে আসে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের বক্তব্যের পর। দীর্ঘদিন জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ফেদোরভ গত সপ্তাহে যুদ্ধ চলাকালীন নির্বাচন আয়োজনের জন্য একটি নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানান। তাঁর যুক্তি ছিল, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা উচিত নয়।

ফেদোরভের বক্তব্য ইউক্রেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি দীর্ঘদিন জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং ইউক্রেনের ড্রোন ও প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধকৌশল গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। গত মাসে তাঁকে আকস্মিকভাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর বরখাস্তের পর ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও হয়। তবে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ তাঁর পুনর্বহালের দাবির সঙ্গে যুদ্ধকালীন নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাবকে এক করে দেখেননি।

ফেদোরভের নির্বাচন আয়োজনের আহ্বানকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এমন দাবি এটাই প্রথম। ফলে এটি শুধু নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক নয়; জেলেনস্কির নেতৃত্ব, যুদ্ধকালীন শাসনব্যবস্থা এবং যুদ্ধের মধ্যেও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব প্রশ্নও সামনে এনেছে।

তবে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখনই নির্বাচন চায় না বলে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে উঠে এসেছে। কিয়েভ ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোসিওলজির ৫ আগস্টের জরিপ অনুযায়ী, ৫৭ শতাংশ ইউক্রেনীয় মনে করেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন হওয়া উচিত। অর্থাৎ রাজনীতিতে নতুন মুখ দেখার আগ্রহ থাকলেও চলমান যুদ্ধের মধ্যে ভোট দেওয়ার বিষয়ে জনগণের বড় অংশের আগ্রহ সীমিত।

জেলেনস্কির প্রতি জনসমর্থনও বর্তমানে মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে এবং প্রায় ৬০ শতাংশের আশপাশে রয়েছে বলে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে আছে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউক্রেনের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে কি না, সেটিও ভবিষ্যতের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জেলেনস্কি অবশ্য যুদ্ধ চলাকালীন নির্বাচনকে পুরোপুরি অসম্ভব বলে উল্লেখ করেননি। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনের মিত্ররা যদি নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে, তাহলে যুদ্ধের মধ্যেও ভোট আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে তাঁর দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো মিত্রদেশ এমন কোনো বাস্তব পরিকল্পনা সামনে আনেনি।

নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্র, প্রার্থী, নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে একটি নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে। রুশ হামলার আশঙ্কার মধ্যে ভোটকেন্দ্র পরিচালনা, সীমান্তবর্তী ও সম্মুখসারির এলাকায় ভোটগ্রহণ, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার এবং বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

এর সঙ্গে রয়েছে দখলকৃত অঞ্চলের প্রশ্ন। ইউক্রেনের যেসব এলাকা রুশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেসব অঞ্চলের ভোটারদের কীভাবে ভোটের আওতায় আনা হবে, সেটিও জটিল। একইভাবে বিদেশে থাকা লাখ লাখ ইউক্রেনীয় নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হলে নতুন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক নাগরিকের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও আলাদা গুরুত্ব দাবি করে।

জেলেনস্কি তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনকে এমন এক ‘সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে বিভক্ত করতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, যুদ্ধের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হলে রাশিয়া সেই বিভাজনকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেতে পারে। যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ, প্রচারণা এবং সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ সামগ্রিকভাবে জাতীয় ঐক্য দুর্বল করতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

অন্যদিকে ফেদোরভের অবস্থান ভিন্ন। তাঁর মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখা উচিত নয়। তিনি নিরাপদ ও আইনসম্মত উপায়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। ফলে ইউক্রেনের সামনে এখন দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় ঐক্য ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অবস্থান, অন্যদিকে যুদ্ধ চললেও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি বজায় রাখার দাবি।

এই বিতর্ক ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে। যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে নির্বাচন কবে হবে এবং বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতা কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টিও ইউক্রেনের রাজনৈতিক আলোচনায় স্থান পেতে পারে।

তবে এই মুহূর্তে জেলেনস্কির অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর কাছে অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধের অবসান এবং ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা। তিনি মনে করেন, যুদ্ধের মধ্যকার নির্বাচন রাজনৈতিক বিভাজন বাড়িয়ে রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচনের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মনে করছেন, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও যুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ফলে ইউক্রেনের নির্বাচন নিয়ে বর্তমান বিতর্ক কেবল একটি ভোটের সময়সূচি নির্ধারণের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনগণের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকায় এসব বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের জনগণের বড় অংশ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিসরে নতুন নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাও পুরোপুরি অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটি ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে।

সবশেষে, ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভারসাম্য বজায় রাখা। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সেই ভারসাম্য রক্ষা তত কঠিন হবে। জেলেনস্কি এখন যুদ্ধের অবসানকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে নির্বাচন নিয়ে নতুন বিতর্ক প্রমাণ করছে, যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত