সরকারি দামে সার নেই, বাড়তি টাকা দিলেই মিলছে

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আমন চাষের মৌসুমে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় সরকারি দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। তাঁদের দাবি, ডিলারের দোকানে গেলে সার নেই বলে জানানো হচ্ছে। পরে একই সার খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের চাপে আমন চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।

উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামের কৃষক শাহজাহান খাঁ তিন একর জমিতে আমন চাষের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। গত শনিবার সার কিনতে কালিশুরি বাজারের মেসার্স তপন ট্রেডার্সে গেলে তাঁকে সার দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে বাধ্য হয়ে এক খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে এক বস্তা টিএসপি ও এক বস্তা ইউরিয়া সার কেনেন ৩ হাজার ১০০ টাকায়।

সরকারি নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা করে। সে হিসাবে দুই বস্তা সারের জন্য তাঁর দেওয়ার কথা ছিল ২ হাজার ৭০০ টাকা। কিন্তু তাঁকে দিতে হয়েছে আরও ৪০০ টাকা বেশি।

শাহজাহান খাঁ বলেন, ডিলারের দোকানে সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, কৃষকের প্রয়োজনের সময়েই এই সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।

একই অভিযোগ করেছেন নওমালা ইউনিয়নের বটকাজলের কৃষক গোকুল বিশ্বাস ও জুরান হাওলাদার এবং বাউফল সদর ইউনিয়নের অলিপুরার কৃষক জসিম উদ্দিন। গোকুল বিশ্বাস তিন একর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেছেন। মূল ডিলারের কাছে সার না পেয়ে তিনিও এক বস্তা ইউরিয়া ও এক বস্তা টিএসপি ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনেছেন।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজি ইউরিয়া সারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। একই দামে বিক্রি হওয়ার কথা টিএসপি। এ ছাড়া ডিএপি সারের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি সারের দাম ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাউফল উপজেলায় সরকার অনুমোদিত সার ডিলার রয়েছেন ১৫ জন। তাঁদের অধীনে সাব-ডিলার রয়েছেন ১০৫ জন। নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রির নিয়ম থাকলেও কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তবে তাঁরা সেই দামে সার পাচ্ছেন না।

উপজেলার চরাঞ্চলে আমন ধানের আবাদ বেশি হওয়ায় এ মৌসুমে ইউরিয়া ও টিএসপি সারের চাহিদাও বেশি। কৃষকদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে এক বস্তা ইউরিয়া কিনতে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। টিএসপির দাম উঠেছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। ডিএপিও ১ হাজার ১৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

দাশপাড়ার কৃষক এমরান ঢালি বলেন, সারের প্রয়োজন বাড়লেই কিছু দোকানি সার নেই বলে জানান। পরে চাহিদামতো বাড়তি টাকা দিতে রাজি হলে সার পাওয়া যায়।

ধুলিয়া ইউনিয়নের জব্বার প্যাদার অভিযোগ, ইউনিয়ন ডিলারের কাছে গেলে তাঁকে বলা হয়, সার খুচরা দোকানে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহ কম ও পরিবহন ব্যয়ের কথা বলে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।

তবে ডিলাররা কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কালিশুরি বাজারের মেসার্স তপন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তপন কুমার বলেন, তিনি সরকারি নির্ধারিত দামেই কৃষক ও দোকানিদের কাছে সার বিক্রি করেন। দোকানিরা পরে বেশি দামে বিক্রি করলে সেটি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

নওমালা ইউনিয়নের ডিলার মেসার্স বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান মামুনও দাবি করেন, কৃষকেরা খুচরা দোকানিদের কাছ থেকে সার কিনে বেশি দাম দিলে এর দায় ডিলারদের ওপর বর্তায় না।

কয়েকজন সাব-ডিলার অবশ্য জানিয়েছেন, ডিলারের কাছ থেকে সার কেনার পর পরিবহন খরচসহ বস্তাপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা লাভ থাকে। এ কারণে তাঁরা কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করেন।

কালাইয়া বাজারের চিত্ত মাস্টার স্টোরের মালিক ও ইউনিয়নের ডিলার জয়দেব দেবনাথ বলেন, তাঁরা কৃষক ও দোকানি—উভয়ের কাছেই নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করেন। পরে দোকানিরা কী দামে বিক্রি করছেন, সেটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের বাউফল উপজেলা শাখার সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, ডিলাররা সরকারি দামেই সার বিক্রি করছেন। তবে গ্রামগঞ্জের কিছু ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি আমন মৌসুমে বাউফলে ৩৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আউশের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৮০৬ হেক্টর। জুলাই মাসে ১৫ ডিলারের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ২৯৫ টন। আগস্টে বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৭৭০ টন।

তবে সার বেশি দামে বিক্রির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহরিয়ার রিজভী লিমন। তিনি বলেন, কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এখন প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার থাকলেও মাঠপর্যায়ে কেন কৃষকেরা নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না। আমন মৌসুমে সারের বাজারে কার্যকর নজরদারি না থাকলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত