মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে বাড়বে জটিলতা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক জোটে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরবে গিয়ে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রও রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব ঢাকাকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কখন এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রটি বিস্তারিত জানায়নি।

সুন্নি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান চলতি মাসে পবিত্র নগরী মক্কায় এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি চুক্তিটির মূল প্রতিশ্রুতি হলো— কোনো এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। তুরস্ক জানিয়েছে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে করা এই প্রতিরক্ষা কাঠামো ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের জন্য উন্মুক্ত।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকায় অবস্থিত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দূতাবাসের মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। বাংলাদেশ সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক বলয় থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার নীতি অনুসরণ করে আসছে।

দেশটির অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সও বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তিনি মনে করেন, কোনো জোটের সদস্য হওয়ার পর বাংলাদেশ কোন ভূরাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করছে—এ প্রশ্ন এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিদ্যমান ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা। পাশাপাশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি ভারতের জন্য স্পর্শকাতর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার কারণে নয়াদিল্লি এমন একটি জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে স্বাভাবিকভাবে নাও নিতে পারে।

তবে বিশ্লেষকেরা এটিও বলছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত কেবল ভারতের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার ধারণা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশকে একই সঙ্গে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।

তাঁর মতে, বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ কয়েকটি দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত দেশের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করেই নিতে হবে।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ তাই শুধু একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অবস্থান, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পশ্চিমা ও এশীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এর সামরিক সুবিধার পাশাপাশি সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতিও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত