প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার পদ্মা নদীসংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নদীভাঙন, পরিবেশ বিপর্যয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের অস্থিরতার অভিযোগের মধ্যে তড়িয়ামহলে দ্বিতীয়বারের মতো লাল পতাকা স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বালু স্থানান্তরে ব্যবহৃত পাইপলাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপের বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের পদ্মা নদীসংলগ্ন পশ্চিম বাহিরচর ও চররুপপুর মৌজার মুন্সিপাড়া ও টিকটিকিপাড়া ঘাট এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুল আরাফাত। তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ডা. গাজী আশিক বাহার এবং ভেড়ামারা থানার পুলিশ সদস্যরা।
অভিযানের সময় তড়িয়ামহল এলাকায় লাল নিশান স্থাপন করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ঠেকাতেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপনসহ একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও একটি অসাধু চক্রের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এবার দ্বিতীয়বারের মতো লাল পতাকা টাঙানোর পাশাপাশি বালু সরানোর কাজে ব্যবহৃত পাইপলাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
পদ্মা নদীর এই অংশে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নদীর নির্দিষ্ট স্থান ও নিয়মের বাইরে গিয়ে বালু তোলার কারণে তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের ভারসাম্যে পরিবর্তন এলে আশপাশের বসতভিটা, কৃষিজমি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে অবৈধ বালু উত্তোলনকে শুধু একটি স্থানীয় ব্যবসায়িক অনিয়ম হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ ও জননিরাপত্তার বিষয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তড়িয়ামহলকে ঘিরে অতীতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের জুন মাসে উপজেলা প্রশাসনের একটি দল ওই এলাকায় গিয়ে বালু উত্তোলন প্রতিরোধে পুরো বালুমহাল এলাকায় লাল পতাকা স্থাপন করে। এর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বাহিরচর ইউনিয়নের বালুমহালের রাস্তা বরাবর লাল পতাকা টাঙিয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, এরপরও বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি চক্র কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগও রয়েছে। নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙন বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নদীতীরবর্তী সাধারণ মানুষ। একদিকে কৃষিজমি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়, অন্যদিকে বসতভিটা ও যোগাযোগব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে। পদ্মার মতো বৃহৎ ও প্রবল স্রোতের নদীতে নদীর তলদেশ বা তীরবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন হলে এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
ভেড়ামারার পদ্মা তীরবর্তী এই এলাকাটি আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এর আশপাশে হার্ডিঞ্জ সেতু, লালন শাহ সেতু, ভারত-বাংলাদেশ কম্বাইন্ড বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পাবনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। অতীতে বালু উত্তোলন ও নদীভাঙন নিয়ে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। নদীর গতিপথে পরিবর্তন কিংবা তীব্র ভাঙন দেখা দিলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রশাসনের বর্তমান পদক্ষেপের সঙ্গে জননিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে।
বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা, সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে বিভিন্ন সময় স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ কারণে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান না থাকলে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান জোরদার হয়েছে। কোথাও বালু ও উত্তোলনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে, কোথাও জরিমানা কিংবা অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি এখন স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বার্থের আলোচনাতেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ভেড়ামারার ঘটনাটিও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিরুল আরাফাত জানিয়েছেন, তড়িয়ামহালে দ্বিতীয়বারের মতো লাল নিশান স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছিল। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও অসাধু চক্রের তৎপরতা পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না বলেও তিনি জানান। তার বক্তব্যে বোঝা যায়, শুধু একবার অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
প্রশাসনের এই অভিযান স্থানীয় মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। নদী থেকে বালু উত্তোলন করে স্বল্পমেয়াদে কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ভার বহন করতে হয় নদীতীরবর্তী মানুষ, কৃষক এবং সাধারণ জনগণকে। নদীভাঙনে একটি পরিবার তার বসতভিটা কিংবা আবাদি জমি হারালে সেই ক্ষতি শুধু অর্থের হিসাবে পরিমাপ করা যায় না। একটি পরিবারের বছরের পর বছর গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, স্মৃতি ও জীবিকার ভিত্তি মুহূর্তেই নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
এ কারণে পদ্মার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে আইন, পরিবেশ এবং জনস্বার্থ—তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বৈধভাবে কোনো বালুমহাল পরিচালনার সুযোগ থাকলেও তা নির্ধারিত সীমা, পরিবেশগত শর্ত ও সরকারি বিধিবিধান মেনে পরিচালিত হওয়া জরুরি। অন্যদিকে নিষিদ্ধ বা অনুমোদনের বাইরে কোনো এলাকায় বালু উত্তোলন হলে তা বন্ধ করতে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তড়িয়ামহালে দ্বিতীয়বারের মতো লাল পতাকা স্থাপন এবং পাইপলাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় প্রশাসন আপাতত কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত নজরদারি, আইনগত ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের ধারাবাহিক তৎপরতার ওপর। শুধু লাল পতাকা স্থাপন করলেই যেন অবৈধ বালু উত্তোলন আবার শুরু না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
পদ্মার ভাঙন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি হার্ডিঞ্জ সেতু, লালন শাহ সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নদী ও নদীতীর রক্ষায় প্রশাসনের অভিযান যদি ধারাবাহিক থাকে এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে ভেড়ামারার মানুষের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ কিছুটা হলেও কমতে পারে। শেষ পর্যন্ত নদী রক্ষা মানে শুধু একটি জলধারাকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের বসতি, জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা।