ন্যাটোতে হামলা ঠেকাতে গোপনে মস্কো সফরে সিআইএ প্রধান

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া যেন ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে না জড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক করতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ গোপনে মস্কো সফর করেছেন বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার রাশিয়ার রাজধানীতে প্রায় আট ঘণ্টা অবস্থান করেন তিনি।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়নে রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পরই র‍্যাটক্লিফের এই বিরল সফর সামনে এসেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেন যুদ্ধের অগ্রগতি নিয়ে হতাশা তৈরি হলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর দৃঢ়তা যাচাই করতে জোটের পূর্বাঞ্চলীয় কোনো সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, র‍্যাটক্লিফের সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের উত্তেজনাকর পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা। বিশেষ করে বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য রুশ পদক্ষেপ ঠেকানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, সম্ভাব্য হুমকির মধ্যে সীমিত স্থল অভিযান ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাইবার হামলা ও অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ড থাকতে পারে। র‍্যাটক্লিফের সফরের সময় রাশিয়ার ওপর ইরানকে দেওয়া সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা কমানোর জন্যও চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে হোয়াইট হাউস সিআইএ পরিচালকের সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।

ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, র‍্যাটক্লিফ মস্কো সফরে রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি। বৈঠক ও সফরের ফলাফল সম্পর্কে পুতিনকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।

র‍্যাটক্লিফের সফরের গুরুত্ব অবশ্য কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার তিনি সফরটিকে ‘মোটামুটি নিয়মিত’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন, সফরটির সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্পর্ক থাকতে পারে।

এর আগে সর্বশেষ ২০২১ সালের নভেম্বরে সিআইএর তৎকালীন পরিচালক উইলিয়াম বার্নস মস্কো সফর করেছিলেন। সে সময় তিনি পুতিনসহ রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান না চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পরই রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে পরিবর্তন

রাশিয়ার ন্যাটো সদস্যদেশে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন আগের তুলনায় উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে, চলতি বছরের শরৎ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে রাশিয়া ন্যাটোর সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

এটি আগের মূল্যায়নের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এর আগে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করতেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী দীর্ঘ সময় ব্যস্ত থাকায় ন্যাটোর বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার সম্ভাবনা কম।

তবে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি না থাকায় মস্কো নতুন করে ঝুঁকি নিতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাল্টিক অঞ্চলের কোনো দেশে সীমিত অভিযান চালিয়ে ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া যাচাই করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

ন্যাটোর সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে জোটের অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর হতে পারে। এই বিধান অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সদস্যদেশগুলো আক্রান্ত রাষ্ট্রকে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

হাইব্রিড কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ

ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও রাশিয়া ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জোটের প্রতিক্রিয়া যাচাই করছে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করছেন। এর মধ্যে সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন কার্যক্রম এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র পোল্যান্ডে আঘাত হানার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। একই সময়ে জার্মানির লিপজিগ/হালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরক বহনকারী তিনটি ড্রোন পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানবন্দরটি ন্যাটো ও ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এ ঘটনায় রাশিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও মস্কো তা অস্বীকার করেছে।

ফ্রান্সেও বাড়ছে সতর্কতা

ইউরোপের অন্য দেশগুলোও সম্ভাব্য রুশ নাশকতা ও হামলা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সেলিন বার্থন বুধবার জানিয়েছেন, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানি ও অবকাঠামোতে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে তারা কাজ করছেন।

লিপজিগ বিমানবন্দরে বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন পাওয়ার ঘটনাটিকেও উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোনটি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে সহায়তা দেওয়া একটি বিমানকে লক্ষ্য করে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।

বার্থনের ভাষ্য, এই ঘটনা ইউরোপীয় ভূখণ্ডে আরও সরাসরি ও সহিংস হামলার আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

এদিকে গত মাসে দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপীয় ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন তথ্য পেয়েছে, যাতে রাশিয়ার সম্ভাব্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে পোল্যান্ডে সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা এবং ইউক্রেনকে দায়ী করে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মস্কোর অবস্থান বরাবরই অস্বীকারমূলক।

র‍্যাটক্লিফের মস্কো সফর তাই শুধু রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধের বাইরে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও ওয়াশিংটনের বাড়তে থাকা উদ্বেগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সফরে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে এবং মস্কো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কি না, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত