প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় লারাক দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। পাল্টাপাল্টি এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রোববার ইরানের সংবাদ সংস্থাগুলোতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বয়ে পরিচালিত তাদের অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘পানিশমেন্ট অব দ্য অ্যাগ্রেসর’। এ অভিযানে জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল আজরাক মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
আইআরজিসির দাবি, হামলায় ‘শত্রুপক্ষের কারিগরি ও মেরামত অবকাঠামো এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ক্ষেত্রগুলো’ ধ্বংস হয়েছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তবে আইআরজিসির হামলার ঘোষণার পর জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। সোমবার ভোরে এসব ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল বলে দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টা সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হবে। তাদের ভাষ্য, প্রতিটি হামলার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
এর আগে রোববার দক্ষিণ ইরানের লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার ঘটনা ঘটে। দ্বীপটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাসের কাছে এবং হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ অংশে অবস্থিত। ইরানের সামরিক ও কৌশলগত কার্যক্রমের কারণে এলাকাটি বর্তমানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির দিকে মাইনবাহী রকেট ছোড়ার প্রস্তুতিতে থাকা লারাক দ্বীপের কয়েকটি লঞ্চারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক মাইন বহনকারী রকেট ছোড়ার জন্য আইআরজিসি প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর লারাক দ্বীপে দুটি ইরানি লঞ্চারে হামলা চালানো হয়।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইরানের অবরোধ সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক সুরক্ষায় বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়েছে।
তবে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ঘিরে প্রায় প্রতিদিনই হামলা ও নিরাপত্তা-ঝুঁকির খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ইরানও নৌপথটি বন্ধ রাখার অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
সাম্প্রতিক সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক কৌশলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইরান এই নৌপথকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ। অন্যদিকে তেহরান বলছে, নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় তারা যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
গত কয়েক মাসের সংঘাতের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপরও পড়ছে। ওয়াশিংটন একই সময়ে সামরিক অভিযান এবং অর্থনৈতিক চাপ—দুই কৌশলেই ইরানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়।
মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে—এমন উদ্বেগের মধ্যেই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা সব মাইন ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে গত সপ্তাহে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন করে মাইন স্থাপনের কাজে যুক্ত কোনো জাহাজ বা নৌযান ধ্বংস করে দেওয়া হবে বলেও ইরানকে সতর্ক করেন তিনি।
তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘প্রোপাগান্ডামূলক’ বক্তব্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের মার্কিন দাবিকে নাকচ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি অভিযোগ করেন, জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ৪ ডলারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে সামরিক অভিযান শুরু করার আগে দাম ছিল ৩ ডলারের কম।
জ্বালানির বাড়তি দাম যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা শুরু করার পর ইরানও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের মধ্যে লারাক দ্বীপে নতুন মার্কিন হামলা এবং জর্ডানে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামরিক উত্তেজনা এখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।