সেপ্টেম্বরে আসছে আড়াই লাখ টন সার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
সেপ্টেম্বরে আসছে আড়াই লাখ টন সার

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বাংলাদেশে নন-ইউরিয়া সার আমদানির কার্যক্রম আবার গতি পেয়েছে। আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে কৃষকদের চাহিদা মেটাতে এবং আগাম মজুদ নিশ্চিত করতে চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) নিয়ে সাতটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজে মোট প্রায় আড়াই লাখ টন সার আসছে। এর মধ্যে এমওপি রয়েছে দেড় লাখ টন, টিএসপি ৬০ হাজার টন এবং ডিএপি ৪০ হাজার টন। কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম শুরুর আগে বিপুল পরিমাণ সার দেশে পৌঁছানোকে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ধান, আলু, সবজি, পেঁয়াজ, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে কোনো একটি সময়ে আমদানি ব্যাহত হলে তার প্রভাব সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও মাঠপর্যায়ের সরবরাহে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের চালান শেষ হওয়ার পরও সার আমদানির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। আগামী অক্টোবর মাসে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে আরও প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আসার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের পাশাপাশি পরবর্তী মাসগুলোর জন্যও আগাম আমদানি পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, চলতি মাসে মরক্কো থেকে ৬০ হাজার টন টিএসপি নিয়ে দুটি জাহাজ দেশে আসবে। এর একটি ৮ সেপ্টেম্বর এবং অন্যটি ১১ সেপ্টেম্বর পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একই দেশ থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি নিয়ে আরও একটি জাহাজ ৮ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছাতে পারে।

এদিকে এমওপি সারের ক্ষেত্রেও আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে। চলতি মাসে রাশিয়া ও কানাডা থেকে মোট দেড় লাখ টন এমওপি আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন করে দুটি লটে ৭০ হাজার টন এবং কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন করে দুটি লটে ৮০ হাজার টন এমওপি আসার কথা রয়েছে। চারটি চালানের মধ্যে দুটি জাহাজ চলতি সপ্তাহে এবং অন্য দুটি ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন শুধু আমদানির বিষয় নয়, বরং উৎস ও পরিবহন ব্যবস্থাপনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ অতীতে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার আমদানি করেছে। সংকটের সময় বিকল্প উৎস হিসেবে কানাডা, রাশিয়া, মরক্কোসহ অন্যান্য দেশের দিকে নজর বাড়ানোর বিষয়টি সামনে আসে।

সারের আমদানিতে বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টি কৃষির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সরবরাহপথে সমস্যা দেখা দিলে নতুন উৎস থেকে সার সংগ্রহ করতে সময় ও অতিরিক্ত অর্থ দুটিই প্রয়োজন হতে পারে। ফলে আগাম চুক্তি, সময়মতো এলসি খোলা এবং পর্যাপ্ত মজুদ রাখা কৃষি খাতের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিএডিসির হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের পিক মৌসুমে ডিএপি সারের চাহিদা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ২৭ হাজার টন। এর বিপরীতে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন ডিএপির পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার টন। একই সময়ে এমওপির চাহিদা ছয় লাখ ৭২ হাজার টন এবং আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনাধীন পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ ৮০ হাজার টন।

টিএসপির ক্ষেত্রেও বড় চাহিদা রয়েছে। চলতি পিক মৌসুমে এই সারের চাহিদা ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ১৯ হাজার টন। এর বিপরীতে চূড়ান্ত আমদানি প্রক্রিয়ায় এবং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় আলোচনাধীন রয়েছে প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার টন।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে ১০ থেকে ১২টি জাহাজ দেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের চালানগুলোর বেশির ভাগই দেশের পথে রয়েছে। অক্টোবরের চালানগুলোর কয়েকটির লোডিং ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বাকিগুলো লোডিং পর্যায়ে রয়েছে। পরবর্তী চালানগুলোর জন্য দ্রুত ঋণপত্র বা এলসি খোলার প্রস্তুতিও চলছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সময়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অক্টোবরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশে শীতকালীন ফসলের পাশাপাশি বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়। এ সময়ে কৃষকের সার চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। শীতকালীন সবজি, আলু, পেঁয়াজ ও ভুট্টার আবাদও একই সময়ে বাড়ে। ফলে এই সময়ের আগে পর্যাপ্ত সার মজুদ না থাকলে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার পাওয়া নিয়ে কৃষকদের অভিযোগও সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এসব ঘটনার পর সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা ও ডিলারদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দেশে সামগ্রিকভাবে সারের সংকট নেই বলে জানানো হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সার আমদানি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। চাহিদা অনুযায়ী প্রতি মাসেই কম-বেশি সার আমদানি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরব ও কাতার থেকে কিছু সময় আমদানিতে বাধা তৈরি হলেও বিকল্প পথে সার আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে সার আমদানি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার কারণ নেই বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিশ্ববাজারের পরিস্থিতিও অবশ্য নজরে রাখতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন সারের দাম ও আমদানির ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় সার উৎপাদনের ওপর গ্যাস সরবরাহের প্রভাব থাকায় আমদানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সংকটে বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির প্রয়োজনীয়তা এ বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরে সাতটি জাহাজে আড়াই লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আসার খবর কৃষি খাতে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করতে পারে। তবে শুধু বন্দরে সার পৌঁছালেই সরবরাহ নিশ্চিত হয় না। আমদানি করা সার দ্রুত খালাস, গুদামজাতকরণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সুষ্ঠু বিতরণ এবং কৃষকের কাছে ন্যায্যমূল্যে পৌঁছে দেওয়াই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা যাতে সরবরাহ সংকটে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ কৃষকের কাছে সার কেবল একটি কৃষি উপকরণ নয়; সময়মতো সার পাওয়া মানে নির্ধারিত সময়ে জমিতে চাষ করা, ফসলের উৎপাদন ধরে রাখা এবং পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাবকে কিছুটা নিশ্চিন্ত রাখা। তাই আগামী কয়েক মাসে আমদানি করা সার কত দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে দেশের কৃষি উৎপাদনের স্বাভাবিক গতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত