তেজগাঁওয়ে রেলের জমি ফের দখলে, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
তেজগাঁওয়ে রেলের জমি ফের দখলে, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশন ও ট্রাকস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি দখল করে আবারও গড়ে উঠছে দোকানপাট, রিকশার গ্যারেজ ও বিভিন্ন ধরনের অবৈধ স্থাপনা। একাধিক দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জায়গা দখলমুক্ত করার পরও সেখানে নতুন করে দখলদারিত্বের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব স্থাপনা গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তেজগাঁও রেলগেট ও ট্রাকস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় প্রায় পাঁচ একর রেলওয়ের জমি বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। কোথাও টিনশেড ঘর, কোথাও দোকান, কোথাও রিকশার গ্যারেজ আবার কোথাও রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়ের নামে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। দখলদারিত্বের কারণে শুধু রেলওয়ের সম্পত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, আশপাশের সড়কে বাড়ছে যানজট, পথচারীদের ভোগান্তি এবং রাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, তেজগাঁও রেলস্টেশন ও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার বিভিন্ন অংশে রেলওয়ের জায়গার ওপর ছোট-বড় দোকান বসানো হয়েছে। কোথাও টিন ও বাঁশ দিয়ে ঘর তৈরি করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। আবার কোথাও বড় ব্যানার টাঙিয়ে রাজনৈতিক কার্যালয়ের আদলে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এসব স্থাপনার আশপাশে চায়ের দোকান, খাবারের হোটেল ও অন্যান্য ছোট ব্যবসাও গড়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গার নিয়ন্ত্রণও বিভিন্ন পক্ষের হাতে চলে যায়। একসময় যে জায়গায় রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ছিল, সেখানে এখন দোকান বসেছে। আবার কোনো কোনো জায়গায় পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নতুন করে গ্যারেজ বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।

রেলওয়ের জমিতে আগে ছাত্রলীগের স্থানীয় ইউনিটের নামে তৈরি করা একটি স্থাপনার জায়গাতেও এখন খাবারের দোকান বসেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। অন্যদিকে মসজিদসংলগ্ন রেললাইনের পাশের প্রায় দুই একর জায়গায় টিনশেড ঘর তৈরি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থাপনার আশপাশে শতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে কার নির্দেশে বা কী প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট দোকান ও স্থাপনা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।

তেজগাঁও রেলগেট এলাকায় রেলওয়ের উচ্ছেদ অভিযানের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি রেলওয়ে সেখানে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ একর জমি দখলমুক্ত করেছিল। সে সময় দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। রেলওয়ের পক্ষ থেকে তখন অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালানোর কথা জানানো হয়েছিল।

কিন্তু উচ্ছেদের পর দীর্ঘ সময় জায়গাটি খালি থাকার পর আবারও সেখানে দখল শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় আধা একর জায়গা বালু দিয়ে ভরাট করে টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানে রিকশা রাখার জন্য গ্যারেজ তৈরি করা হয়েছে। গ্যারেজটি স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কয়েক সপ্তাহ আগে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জায়গাটি দখলে নিয়ে দ্রুত বালু ফেলে সমতল করেন। পরে টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে সেখানে রিকশা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনাগোনাও বাড়ে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

অবৈধভাবে তৈরি গ্যারেজে রিকশা রাখা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সেখানে রিকশা রাখার বিনিময়ে টাকা নেওয়া হয়। তবে সেই টাকা কার কাছে দেওয়া হয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের গ্যারেজ ও দোকান থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

তেজগাঁওয়ের এই দখলদারিত্বের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের চলাচলে। কারওয়ান বাজার, বেগুনবাড়ী, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও আশপাশের এলাকার মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। দিনের বেলায় ভারী যানবাহন ও দোকানের ভিড়ে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

কারওয়ান বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, যানজটের কারণে অনেক সময় রিকশা বা অন্য যানবাহনে করে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। ফলে তাঁরা বাধ্য হয়ে হেঁটে চলাচল করেন। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাত ও সড়কের বিভিন্ন অংশে মানুষের অবস্থান, যানবাহনের চাপ এবং নানা ধরনের অনিয়মের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, দিনের বেলায় যানজট আর রাতের বেলায় নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই এলাকাটি সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সন্ধ্যার পর রাস্তার বিভিন্ন অংশে আড্ডা বসে এবং কোথাও কোথাও মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে রাতে ওই পথ দিয়ে চলাচল করা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

তেজগাঁওয়ের জমি দখলের সমস্যা শুধু সাম্প্রতিক নয়। দীর্ঘদিন ধরেই রেলওয়ের জমি, ট্রাকস্ট্যান্ড এবং সড়ক দখল করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা ও যানবাহন রাখার প্রবণতা রয়েছে। অতীতেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই আবার দখল ফিরে আসার অভিযোগ রয়েছে। অতীতের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তেজগাঁওয়ের ট্রাকস্ট্যান্ড ও সড়ক দখল করে দোকান, গ্যারেজ এবং যানবাহন রাখার কারণে যানজট ও পথচারীদের দুর্ভোগের বিষয়টি উঠে এসেছে।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পর রেলওয়ের উদ্ধার করা জমি কীভাবে আবার দখলে চলে যাচ্ছে। শুধু উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি উদ্ধার করা জমির সীমানা নির্ধারণ, স্থায়ীভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে—এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

রেলওয়ের জমি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। এ জমি অবৈধভাবে দখল করে ব্যক্তিগত ব্যবসা বা সংগঠনের কার্যালয় তৈরি হলে একদিকে সরকারি সম্পদের ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে ওই এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা ও যানবাহনের চাপ বাড়ে। তেজগাঁওয়ের মতো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চলে এর প্রভাব আরও বেশি।

রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এবিএম কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, রেলওয়ের জায়গা ও প্ল্যাটফর্ম থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে ময়মনসিংহে উচ্ছেদ অভিযান চলছে। এরপর পর্যায়ক্রমে রাজধানীর তেজগাঁও স্টেশন এলাকাতেও সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে বলে তিনি জানান।

রেলওয়ের এই বক্তব্যে উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে আশার কথা থাকলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, অতীতে উচ্ছেদ করা জমি যাতে আবার দখলে না যায়, সে নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হবে। কারণ, তেজগাঁওয়ের বর্তমান চিত্র দেখাচ্ছে, শুধু অভিযান পরিচালনা করে জায়গা খালি করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি জমি দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে উচ্ছেদের পাশাপাশি উদ্ধার করা সম্পত্তির সীমানা চিহ্নিত করা, নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত পুনর্দখলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে ট্রাক, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকলে দখলমুক্ত করা জায়গার ওপর আবারও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা ও পথচারীদের প্রত্যাশা, এবার শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা হবে। রেলওয়ের জমি যদি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই সংরক্ষিত থাকে, তবে সেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে অবৈধ দোকান ও গ্যারেজের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একসময় উচ্ছেদ করে খালি করা জমি আবার যদি কয়েক মাস বা এক বছরের ব্যবধানে দোকান, গ্যারেজ কিংবা রাজনৈতিক স্থাপনায় ভরে যায়, তাহলে উচ্ছেদ অভিযান তার মূল উদ্দেশ্য হারায়। তেজগাঁওয়ের বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি জমি দখলের ঘটনা নয়; এটি সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ, নগর ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত