প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামে নিরাপদ পানির সংকট, পানির উৎসে দূষণ, লবণাক্ততা ও দুর্বল স্যানিটেশনব্যবস্থা ডায়রিয়া ও কলেরার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। নগর থেকে উপকূলীয় উপজেলা—বিভিন্ন এলাকায় পানির উৎস ও ব্যবহারের ধরন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষার আগের শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কমে যাওয়া, অনিয়মিত সরবরাহ এবং বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চন্দ্রনগর এলাকার একটি কলোনিতে ডায়রিয়ার আকস্মিক সংক্রমণ সেই উদ্বেগকে সামনে এনেছে। গত ১৭ জুলাই ওই কলোনিতে অল্প সময়ের মধ্যে অন্তত ১৭ জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাঁদের মধ্যে আবদুল মতিন নামের ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। আক্রান্তদের অধিকাংশই ছিলেন একই কলোনির বাসিন্দা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কলোনির পানি সরবরাহের ট্যাংকটি পরিষ্কার করা হয়নি। পরে ট্যাংকের ভেতরে মৃত ইঁদুর ও তেলাপোকা পাওয়ার কথাও জানান তাঁরা। ঘটনার পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা সেখানে গিয়ে পানির নমুনা পরীক্ষা করেন। প্রাথমিকভাবে অপরিষ্কার ট্যাংকের পানি থেকেই ডায়রিয়া ছড়ানোর সম্ভাবনার কথা উঠে আসে।
একটি পানির ট্যাংকের অপরিচ্ছন্নতা হয়তো একটি নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা। কিন্তু চট্টগ্রামে ডায়রিয়া ও কলেরার ঝুঁকির পেছনে পানির নিরাপত্তা নিয়ে যে বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, সাম্প্রতিক একটি গবেষণা সেটিই নতুন করে সামনে এনেছে।
২০২৩ সালে চট্টগ্রামে তীব্র ডায়রিয়ার বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। ১ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত মাত্র ৪৫ দিনে নগর ও জেলার চারটি উপজেলায় হাসপাতালগুলোতে তীব্র পানির মতো ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৭ হাজার ৯৫৬ জন ভর্তি হয়েছিলেন। পটিয়ায় ভর্তি হন ১ হাজার ৫৯৬ জন, বোয়ালখালীতে ১ হাজার ৮৭ জন, আনোয়ারায় ১ হাজার ৩৯ জন এবং চন্দনাইশে ১ হাজার ৩৩ জন। একই সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার ৩৩৪ জন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে ১ হাজার ৮৬৭ জন ভর্তি হন।
এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষকদের করা একটি বর্ণনামূলক গবেষণা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ১৬৬ রোগীর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়। তাঁদের সবাই পানির মতো পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত ছিলেন এবং ৮৫ শতাংশের বমিও হয়েছিল। ২৩ জনের মলের নমুনা পরীক্ষা করে ছয়জনের মধ্যে কলেরার জীবাণু ভিব্রিও কলেরি পাওয়া যায়।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রোগী বাড়ার সঙ্গে পানির উৎস, স্যানিটেশন ও পরিবেশগত অবস্থার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা। গবেষকেরা বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডী এলাকায় তিনটি নলকূপ ও পাঁচটি পুকুরের পানির নমুনা পরীক্ষা করেন। সেখানে বিভিন্ন মাত্রায় কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। তিনটি নলকূপের দুটির পানিতে কলিফর্ম শনাক্ত হয়। পাঁচটি পুকুরের সব কটিতেই কলিফর্ম ছিল। একটি নলকূপের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে কলিফর্মের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার পর্যন্ত। একটি পুকুরে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার।
শুধু ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিই নয়, পানির লবণাক্ততাও গবেষকদের নজরে এসেছে। পরীক্ষিত পানির নমুনায় লবণাক্ততার মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে ২১০ থেকে ২ হাজার ৩২০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। পাঁচটি পুকুরের মধ্যে দুটির পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা প্রতি লিটারে এক হাজার মিলিগ্রামের বেশি ছিল।
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে আরও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা যেসব নলকূপকে গভীর নলকূপ হিসেবে ব্যবহার করতেন, সেগুলোর অনেকটির গভীরতা ২৫০ ফুটের বেশি ছিল না। কোনো কোনো নলকূপের অবস্থান ছিল শৌচাগারের কাছাকাছি। আবার কয়েকটি পুকুরে শৌচাগারের বর্জ্য সরাসরি মিশতে দেখা যায়। এসব পুকুর গোসল, কাপড় ধোয়া এবং অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করতেন স্থানীয় মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ পানির ওপর মানুষের নির্ভরতা কমে গিয়ে অনিরাপদ উৎস ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপজেলা এলাকার ৯৬ রোগীর মধ্যে ৫৫ জনের পানীয় জলের প্রধান উৎস ছিল গভীর নলকূপ এবং ৩৮ জন সাধারণ নলকূপের পানি ব্যবহার করতেন। গৃহস্থালির কাজে ৫৩ জন পুকুরসহ ভূ-উপরিস্থ পানির ওপর নির্ভর করতেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, উপজেলা এলাকার ৮৩ শতাংশ রোগী জানিয়েছেন, তাঁরা পানি বিশুদ্ধ করতেন না।
নগর এলাকার চিত্র আবার কিছুটা ভিন্ন। ৭০ রোগীর মধ্যে ৩৮ জনের প্রধান পানীয় জলের উৎস ছিল চট্টগ্রাম ওয়াসার সরবরাহ করা পানি। ২২ জন গভীর নলকূপ, ছয়জন সাধারণ নলকূপ এবং চারজন বোতলজাত পানি ব্যবহার করতেন। তাঁদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পানির সংকটের কথা জানিয়েছেন। ৪৭ শতাংশ পানি বিশুদ্ধ না করেই ব্যবহার করতেন।
তবে গবেষকেরা একটি বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। নগরের রোগীদের অনেকে ওয়াসার পানি ব্যবহার করলেও ওয়াসার পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে ওয়াসার পানি থেকেই রোগ ছড়িয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং অনিয়মিত পানি সরবরাহকে একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সরবরাহ বন্ধ হলে পাইপলাইনের ভেতরের চাপ কমে যেতে পারে। পাইপে ফুটো বা ক্ষত থাকলে তখন বাইরের দূষিত পানি ভেতরে ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাব কোনো একটি নির্দিষ্ট উৎস থেকে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া রোগের চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আনোয়ারা ও পটিয়ায় রোগী বাড়তে শুরু করে। দ্বিতীয় সপ্তাহে নগর এলাকায় এবং তৃতীয় সপ্তাহে বোয়ালখালী ও চন্দনাইশে রোগী বাড়ে। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকায় রোগী বাড়ার এই ধারাবাহিকতা একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ উৎসের সংস্পর্শের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষকেরা তাই একটি মাত্র কারণকে দায়ী করেননি। অনিরাপদ পানি, পানির সংকট, লবণাক্ততা, দুর্বল স্যানিটেশন এবং পানি বিশুদ্ধ না করার প্রবণতা—সবগুলো বিষয়কে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা স্পষ্ট করেছেন, পরীক্ষিত পানির জীবাণুর সঙ্গে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে পাওয়া কলেরার জীবাণুর সরাসরি জিনগত সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট কোনো পানির উৎস থেকেই রোগীরা আক্রান্ত হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়ে চলতি বছরের ডায়রিয়ার পরিসংখ্যানে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ২৬ হাজার ৬০২ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। মাসে গড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। শুধু আগস্টেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৮১ জন।
উপকূলীয় জেলা হিসেবে চট্টগ্রামের জন্য লবণাক্ততা আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে গেলে পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়তে পারে। নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হলে মানুষ বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। সেই বিকল্প উৎস যদি দূষিত হয়, তাহলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
গবেষণায় চট্টগ্রামে ডায়রিয়ার মৌসুমি প্রবণতারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আগের কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে এপ্রিল থেকে জুন এবং আগস্ট থেকে অক্টোবর—এই দুই সময়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধে শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা শুধু পান করার জন্য নয়; রান্না, খাবার তৈরি, বাসন ধোয়া ও দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজেও নিরাপদ পানি প্রয়োজন। বাড়ির পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করা, নলকূপ ও শৌচাগারের অবস্থানের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং পুকুর বা জলাশয়ে পয়োবর্জ্য পড়া বন্ধ করা জরুরি।
কোনো এলাকায় হঠাৎ ডায়রিয়ার রোগী বাড়লে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ওই এলাকার পানির উৎসও দ্রুত পরীক্ষা করা দরকার। পানির ট্যাংক, পাইপলাইন, নলকূপ, পুকুর এবং স্যানিটেশনব্যবস্থা একই সঙ্গে পরিদর্শন করা গেলে সম্ভাব্য দূষণের উৎস দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তাই একটি বড় জনস্বাস্থ্য বার্তা দিচ্ছে। ডায়রিয়া বা কলেরা কেবল হাসপাতালের রোগ নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে পানি, স্যানিটেশন, পরিবেশ ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন। একটি অপরিষ্কার পানির ট্যাংক যেমন একটি কলোনিতে বিপদ ডেকে আনতে পারে, তেমনি দূষিত পুকুর, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন কিংবা অনিয়মিত পানি সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রামে সেই ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ, নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা, পাইপলাইন ও পানির ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণ, স্যানিটেশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রোগতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত নজরদারি একসঙ্গে জোরদার করার বিকল্প নেই। বিশেষ করে ডায়রিয়ার মৌসুমি প্রকোপ শুরুর আগেই প্রস্তুতি নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।