বাধা এলে ছয় দফা এক দফা হবে: নাহিদ ইসলাম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
বাধা এলে ছয় দফা এক দফা হবে: নাহিদ ইসলাম

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হলে ঘোষিত ছয় দফা দাবি এক দফায় পরিণত হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, নানা বাধা ও প্রতিকূলতা থাকলেও লংমার্চ চট্টগ্রামের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাবে এবং কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই পালন করা হবে।

শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। পরে শাপলা চত্বরের সমাবেশ শেষ হলে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের গাড়িবহর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

ছয় দফা দাবিকে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জনগণের বিভিন্ন সমস্যা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সামনে এনে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাই এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। কর্মসূচির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার কথাও আয়োজকদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে।

শাপলা চত্বরের সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, যত বাধা-বিপত্তিই আসুক, ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ চট্টগ্রামে পৌঁছাবে। তাঁর বক্তব্যে মাদক, চাঁদাবাজি এবং গণভোটের রায় উপেক্ষার অভিযোগের বিষয়গুলোও উঠে আসে। তিনি বলেন, লংমার্চ মাদকের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এবং গণভোটের গণরায় যারা উপেক্ষা করেছে তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা দেবে।

নাহিদ আরও বলেন, দেশে নতুন করে যারা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার পথে রয়েছে, তাদের সেই পথ বন্ধ করার লক্ষ্যেও এই লংমার্চের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, কর্মসূচিটিকে শুধু ছয় দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি বৃহত্তর বার্তা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও দেখছে এনসিপি ও তাদের মিত্ররা।

এর আগে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চটি রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হবে। পথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা করার কর্মসূচিও রাখা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে জোটের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের প্রত্যাশার কথাও আয়োজকেরা জানিয়েছেন।

লংমার্চের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকটের সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রশাসনের সর্বস্তরকে দলীয়করণমুক্ত করার দাবি। এসব দাবির সঙ্গে জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকট ও রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলোকে যুক্ত করেছে ১১ দলীয় ঐক্য।

বিশেষ করে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে মানুষের উদ্বেগের বিষয়টি রাজনৈতিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেল ও সারের সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্য এসব বিষয়কে রাজপথের কর্মসূচির মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধের দাবিও কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা না গেলে নাগরিক অধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং গণভোটের ফল বাস্তবায়নের দাবিকে তারা রাজনৈতিক জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করছে।

লংমার্চ ঘিরে নিরাপত্তা ও জনভোগান্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে পুরো পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গাড়িবহরের আকার নিয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কয়েক দিন আগে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, যানজট ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ যেমন রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ ঘটায়, তেমনি মহাসড়কে দীর্ঘ গাড়িবহর চলাচলের কারণে সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে কর্মসূচির রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে ‘ছয় দফা এক দফায় পরিণত’ করার যে সতর্কবার্তা এসেছে, তা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, লংমার্চে বাধা সৃষ্টি করা হলে আন্দোলনের দাবি আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিতে পারে। তবে এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ চরিত্র বজায় রাখার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বারবার দাবি করছেন, তাঁদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। বিভিন্ন জেলা ও মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পথসভা ও সমাবেশের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। কুমিল্লাসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয়তার খবর পাওয়া গেছে। ফলে লংমার্চটি শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক না থেকে পথে পথে রাজনৈতিক জমায়েতের রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

শাপলা চত্বর থেকে লালদীঘি পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রায় রাজনৈতিক বক্তব্য, পথসভা ও নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য তাদের দাবিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাইছে। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও দৃশ্যমান করার লক্ষ্যও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে প্রতীয়মান হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে যেমন বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, তেমনি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ বড় ধরনের রাজনৈতিক জমায়েতের সময় সামান্য উত্তেজনাও দ্রুত জনদুর্ভোগ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে যে কঠোর রাজনৈতিক বার্তা উঠে এসেছে, তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা হবে, তা নির্ভর করবে লংমার্চের পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ছয় দফা দাবি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর। আপাতত ১১ দলীয় ঐক্যের এই কর্মসূচি দেশের চলমান রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ছয় দফা দাবি নিয়ে শুরু হওয়া এই লংমার্চ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে যায়, নাকি আরও বড় আন্দোলনের সূচনা করে—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত