রনজিলা হত্যা: র‌্যাবের তদন্তে বাইক ও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
রনজিলা হত্যা: র‌্যাবের তদন্তে বাইক ও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় রিকশা থেকে পড়ে বগুড়ার প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনায় র‌্যাবের গ্রেপ্তার ও উদ্ধার করা মোটরসাইকেল নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন সামনে এসেছে। ঘটনার পর দ্রুত সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানানো হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভিডিও, সময়ের হিসাব ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে র‌্যাবের উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে কিছু অসংগতি থাকার দাবি উঠেছে।

গত ২৯ আগস্ট ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন রনজিলা পারভিন। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা চিকিৎসার জন্য স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। গাবতলী বাস টার্মিনালে নামার পর তাঁরা রিকশায় করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ টান দিলে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে সড়কে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

একজন শিক্ষিকার এমন আকস্মিক মৃত্যু তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসে আর বাড়ি ফিরতে পারেননি রনজিলা। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে থামিয়ে দেয়নি, বরং রাজধানীতে পথচারী ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়। পরদিন র‌্যাব-২ দুই সন্দেহভাজন এবং একটি মোটরসাইকেলের মালিককে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ব্রিফিংয়ের পর থেকেই মোটরসাইকেলটির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার সময় সংসদ ভবন এলাকায় যে মোটরসাইকেল দেখা যায়, তার রং ও মডেলের সঙ্গে র‌্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভিডিওতে নীল রঙের একটি মোটরসাইকেল দেখা গেলেও র‌্যাবের প্রকাশ করা উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি রূপালি ও কালো রঙের বলে দেখা যায়। এ পার্থক্যই তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

র‌্যাবের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটিই ঘটনার সময় ব্যবহৃত হয়েছিল। র‌্যাব-২ অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান জানিয়েছেন, নিহত শিক্ষিকার স্বামীকে মোটরসাইকেলটি দেখানো হলে তিনি সেটিকে ঘটনার সময় দেখা বাইক হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন।

তবে নিহতের স্বামী আব্দুল মতিনের বক্তব্যে বিষয়টি ভিন্নভাবে উঠে এসেছে। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার সময় তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ছিনতাইয়ের মুহূর্তে মোটরসাইকেলের রং বা মডেল খেয়াল করার মতো পরিস্থিতি তাঁর ছিল না। ফলে তিনি কোনো নির্দিষ্ট রং বা মডেলের মোটরসাইকেল শনাক্ত করার দাবি করেননি।

এদিকে মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিব বেপারি ওরফে রাকিব হোসেন বেপারিকে নিয়েও তদন্তের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মামলার এফআইআরে ছিনতাইয়ের সময় হিসেবে ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু রাকিবের বাসার গ্যারেজের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই সময় মোটরসাইকেলটি গ্যারেজে থাকার দাবি করা হয়েছে।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে রাত ২টা ৬ মিনিটের দিকে রাকিবকে মোটরসাইকেলটি চালিয়ে তাঁর পশ্চিম আরজতপাড়ার বাসায় ঢুকতে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্ট ভিডিও থেকে জানা গেছে। তাঁর বন্ধু হৃদয়ও দাবি করেছেন, রাত প্রায় ২টা পর্যন্ত তাঁরা তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজের সামনে ছিলেন। পরে দুজন একই মোটরসাইকেলে রাকিবের বাসায় যান।

হৃদয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রাকিবের বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্ত্রী খাবার রেখে দিয়েছিলেন। সেই খাবার নেওয়ার জন্য রাকিবের সঙ্গে তিনি বাসায় যান। এরপর কিছু সময় পর তিনি চলে যান।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাত ৩টা ৪৮ মিনিট, ভোর ৫টা, সাড়ে ৫টা, ৫টা ৩২, ৫টা ৩৫ এবং ৫টা ৫৫ মিনিটের আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে মোটরসাইকেলটি একই গ্যারেজে অবস্থান করছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব তথ্য সত্য হলে মোটরসাইকেলটি ঘটনার সময় কীভাবে সংসদ ভবন এলাকায় গেল—সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

রাকিবের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলামও র‌্যাবের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। র‌্যাব কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, পনি নামের এক ব্যক্তি ২৬ আগস্ট থেকে ২৯ আগস্ট বিকেল পর্যন্ত রাকিবের মোটরসাইকেলটি নিয়ে রেখেছিলেন এবং বিভিন্ন সময় তিনি মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু সুমাইয়ার দাবি, ওই সময় বাইকটি রাকিবের কাছেই ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে রাকিব বাইকটি নিয়ে বাসায় ফিরেছিলেন এবং পরে ঘটনার দিন রাতে আবার সেটি নিয়ে বের হন।

এখানে তদন্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সিসিটিভি ফুটেজের ধারাবাহিকতা। কোনো একটি ক্যামেরার ফুটেজের ওপর নির্ভর না করে মোটরসাইকেলটির গতিপথ, নম্বরপ্লেট, চালক ও আরোহীর পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ের অবস্থান মিলিয়ে দেখা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

গ্রেপ্তার হওয়া পনি ওরফে প্যারা পনি এবং সেড্রিক জুলিয়ানের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মামলার এফআইআরে তাঁদের একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে ৩০ আগস্ট সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তাকর্মীদের বক্তব্যে গ্রেপ্তারের স্থান ও সময় নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

একটি আবাসিক ভবনের নিরাপত্তাকর্মী খোরশেদ আলমের ভাষ্য, ৩০ আগস্ট রাত প্রায় পৌনে ২টার দিকে র‌্যাবের লোকজন এসে পনিকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর দাবি, ওই ভবন থেকে একজনকেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে সেড্রিককে কাছাকাছি অন্য একটি বাড়ি থেকে ভোরে গ্রেপ্তার করা হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, মামলার নথিতে উল্লেখ করা গ্রেপ্তারের সময় ও স্থান এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্যের কারণ কী। আইনগত প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তারের স্থান ও সময় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ ধরনের অসংগতি থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

পনির পরিবারের পক্ষ থেকেও তাঁকে ফাঁসানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাঁদের দাবি, স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে পনির পুরোনো বিরোধ ছিল এবং সেই বিরোধের কারণে তাঁর নাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যও নিশ্চিতভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

র‌্যাব অবশ্য তাদের তদন্তের ভিত্তি হিসেবে স্থানীয় সোর্স ও বিভিন্ন তথ্যের কথা জানিয়েছে। র‌্যাব-২ অধিনায়ক বলেছেন, ঘটনার ছবি ও ভিডিও স্থানীয় সোর্সদের দেখানো হলে প্রায় ১৫ জন ব্যক্তি পনিকে শনাক্ত করেছেন বলে তাঁরা দাবি করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এটিও বলেছেন, সিসিটিভিতে সবকিছু খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল না এবং পনি ও সেড্রিককে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্তে পাওয়া তথ্য, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত কার বিরুদ্ধে অভিযোগ টেকসই হবে, তা নির্ধারিত হবে।

র‌্যাবের ব্রিফিংয়ে পনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি তাঁর মোটরসাইকেলের রং নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, তাঁর বাইকের রং রূপালি ও কালো হলেও সিসিটিভিতে ছিনতাইয়ের সময় যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, সেটি নীল রঙের। সাংবাদিকদের বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধও করেন তিনি।

এ অবস্থায় তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেলটি। বাইকের নম্বরপ্লেট, চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর, মালিকানা, ব্যবহারের ইতিহাস এবং ঘটনার সময় তার অবস্থান প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা হলে বিতর্কের বড় একটি অংশের সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে সংসদ ভবন এলাকার বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজ ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

রনজিলা পারভিনের পরিবারও দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। স্বামী আব্দুল মতিনের বক্তব্যেও সেই প্রত্যাশাই উঠে এসেছে। তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ত্রীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও অপরাধীদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া।

একজন শিক্ষিকার জীবন কেড়ে নেওয়া এই ঘটনায় তদন্তের প্রতিটি ধাপ তাই গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত গ্রেপ্তার যেমন জনমনে স্বস্তি দিতে পারে, তেমনি পরে যদি তদন্তের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণে রনজিলা হত্যা মামলায় প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত প্রমাণ, গ্রেপ্তারের নথি এবং উদ্ধার করা মোটরসাইকেল—সবকিছু সমন্বিতভাবে যাচাই করা জরুরি।

র‌্যাব জানিয়েছে, তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহভাজনদের বিষয়ে আরও তথ্য পরিষ্কার হবে। এখন সেই তদন্ত কতটা প্রমাণনির্ভর, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়। রনজিলার পরিবার, তাঁর সহকর্মী এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধী যেন কোনোভাবেই আইনের আওতার বাইরে না থাকেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত