রাজশাহী থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
রাজশাহী থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হঠাৎ বাস বন্ধ। কাউন্টারে টিকিট হাতে অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা। কেউ গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে বাস কাউন্টার থেকেই ফিরে যাচ্ছেন। রাজশাহী ও নাটোরের বাস মালিক-শ্রমিকদের বিরোধের জেরে রাজশাহী থেকে দূরপাল্লাসহ বিভিন্ন আন্তঃজেলা রুটে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

শনিবার সকালেও রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন বাস কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে যারা আগেই টিকিট কেটেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এসে জানতে পারেন বাস চলবে না। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জরুরি কাজে দূরের শহরে যাওয়া মানুষ, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীরা।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিরোধের সূত্রপাত বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী থেকে দর্শনাগামী রাব্বি পরিবহনের একটি বাসকে কেন্দ্র করে। বাসটি রাজশাহী থেকে দর্শনার উদ্দেশে যাওয়ার পথে নাটোরে পৌঁছালে স্থানীয় বাস মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সেটি আটকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বাসের যাত্রীদের নামিয়ে অন্য একটি বাসে তুলে দর্শনার দিকে পাঠানো হয়।

রাজশাহীর পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, রাব্বি পরিবহনের বাসটি সংশ্লিষ্টদের অনুমতি নিয়েই রাজশাহী থেকে ছেড়েছিল। রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম হেলালের অনুমতি নেওয়ার কথা তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নাটোরে পৌঁছানোর পর স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বাসটি আটকে দেন এবং যাত্রীদের অন্য পরিবহনের বাসে তুলে দেন।

অন্যদিকে নাটোরের পরিবহনসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, রাব্বি পরিবহনের বাসটি নির্ধারিত নিয়ম বা প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া নাটোর হয়ে ওই রুটে চলাচল করছিল। এ কারণেই বাসটি আটকে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বাসের রুটে চলাচলের অনুমতি ও পরিবহন মালিকদের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতার প্রশ্ন।

ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ও সড়ক পরিবহন গ্রুপের পক্ষ থেকে নাটোরের তুহিন পরিবহনের তিনটি বাস আটক করা হয় বলে জানা গেছে। পরে নাটোরে আটক রাব্বি পরিবহনের বাসটি ছেড়ে দেওয়া হলে রাজশাহীতে আটক তুহিন পরিবহনের বাসগুলোও ছেড়ে দেওয়া হয়।

বাসগুলো ছেড়ে দেওয়ার পরও অবশ্য বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি। এরই মধ্যে রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ও সড়ক পরিবহন গ্রুপ নাটোর হয়ে চলাচলকারী বাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে প্রথমে রাজশাহী-নাটোর রুটে অচলাবস্থা তৈরি হলেও পরে এর প্রভাব পড়ে রাজশাহী থেকে বিভিন্ন আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার রুটেও।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, নাটোরের ওপর দিয়ে রাজশাহী থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নিয়মিত বাস চলাচল করে। ফলে একটি নির্দিষ্ট রুটের পরিবহন বিরোধ দ্রুত বড় পরিসরের যাত্রী পরিবহন সংকটে রূপ নেয়।

শুক্রবার সকাল থেকেই রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন কাউন্টারে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কেউ আগে থেকে টিকিট কেটে বাসের আশায় ছিলেন, আবার কেউ পরিস্থিতি জানতে কাউন্টারগুলোতে গিয়ে ফিরে আসেন। দূরপাল্লার যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে ট্রেন, ভাড়া করা গাড়ি বা অন্য কোনো পরিবহনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন।

রাজশাহী থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এক যাত্রী বলেন, জরুরি কাজে তাঁকে ঢাকায় যেতে হবে। বাসের টিকিট কাটার পর কাউন্টারে এসে জানতে পারেন, বাস চলাচল বন্ধ। মালিক ও শ্রমিকদের বিরোধের কারণে সাধারণ যাত্রীদের কেন দুর্ভোগে পড়তে হবে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আরেক যাত্রী পরিবার নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, হঠাৎ বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। কখন বাস চলাচল স্বাভাবিক হবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। দ্রুত দুই পক্ষ আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করবে—এমন প্রত্যাশা তাঁর।

পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের একাংশের বক্তব্য, মালিকদের বিরোধের প্রভাব শ্রমিকদের ওপরও পড়ে। বাস বন্ধ থাকলে চালক, সহকারী ও অন্যান্য পরিবহনকর্মীরা যেমন আয় হারান, তেমনি যাত্রীদেরও ভোগান্তি বাড়ে। নিয়ম মেনে বিভিন্ন রুটে বাস চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

নাটোরের পরিবহনসংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজশাহীর একটি বাস রুটের নিয়ম না মেনে নাটোরের ওপর দিয়ে চলাচল করাকে কেন্দ্র করেই মূল বিরোধের সূত্রপাত। তাঁদের দাবি, এ ধরনের রুট পরিচালনার ক্ষেত্রে দুই জেলার পরিবহন মালিকদের মধ্যে যে সমন্বয় ও অনুমতির বিষয় রয়েছে, তা মেনে চলা প্রয়োজন। অন্যদিকে রাজশাহীর পক্ষ বলছে, সংশ্লিষ্ট অনুমতি নিয়েই বাস চলাচল করছিল এবং নাটোরে বাস আটকে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বিরোধটি এখন কেবল একটি পরিবহনের বাস নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে দুই জেলার পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন। ফলে সাধারণ যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

উত্তরবঙ্গ বাস মালিক সমিতির মহাসচিব ও রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নাটোর ও রাজশাহীর বাস মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। এ কারণে রাজশাহী থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।

পরিবহন খাতের এই বিরোধের প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। রাজশাহী উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিক্ষাকেন্দ্র। প্রতিদিন এই শহর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য আন্তঃজেলা বাস যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বাস বন্ধ থাকলে এসব মানুষের সময় ও অর্থ—দুইয়ের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

বিশেষ করে জরুরি রোগী, চাকরির পরীক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসায়িক কাজ কিংবা নির্ধারিত সময়ের যাত্রার ক্ষেত্রে বাস বন্ধের প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। বিকল্প যানবাহনের সংখ্যা সীমিত হলে ভাড়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। একই সঙ্গে বাস টার্মিনাল ও সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ও স্বার্থের বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রুট পরিচালনা, অনুমতি, যাত্রী পরিবহন এবং বিভিন্ন পরিবহনের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে থাকা অস্পষ্টতা বা বিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। কোনো একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চলের গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি। দুই জেলার মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে আলোচনায় বসিয়ে রুট পরিচালনার নিয়ম, অনুমতির কাঠামো এবং ভবিষ্যতে কোনো বাস আটকে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি কীভাবে এড়ানো যায়, সে বিষয়ে একটি কার্যকর সমঝোতা প্রয়োজন।

শুক্রবার থেকে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা শনিবারেও অব্যাহত থাকায় এখন যাত্রীদের মূল প্রশ্ন—কবে আবার স্বাভাবিক হবে বাস চলাচল। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তিই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ, একটি বাসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ ইতোমধ্যে বৃহত্তর গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে।

রাজশাহীর বাস কাউন্টারে টিকিট হাতে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কাছে তাই মালিক-শ্রমিক বিরোধের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে একটি সাধারণ প্রশ্ন—তাঁরা কখন নিরাপদ ও স্বাভাবিকভাবে নিজেদের গন্তব্যে যেতে পারবেন। দুই পক্ষের দ্রুত আলোচনায় বসে সমাধানে পৌঁছানোই পারে সেই অনিশ্চয়তার অবসানের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত