সারের দাবিতে উত্তাল কয়েক জেলা, গুদাম ভেঙে সার নিলেন কৃষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
সারের দাবিতে উত্তাল কয়েক জেলা, গুদাম ভেঙে সার নিলেন কৃষক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের সংকট ও সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষ তীব্র হয়ে উঠেছে। কোথাও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, কোথাও সারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকেরা। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই জেলার ভূরুঙ্গামারীতে সার না পেয়ে কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করেন বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা।

এদিকে রাজশাহীর পুঠিয়া ও লালমনিরহাটে সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে জয়পুরহাটে সার বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগে দুই ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। মাগুরায় অবৈধভাবে মজুত করা ৩২৮ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরপর এসব ঘটনায় আমন মৌসুমে সার সরবরাহ, বিতরণব্যবস্থা এবং ডিলার পর্যায়ে নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সোমবার সকালে সারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন কৃষকেরা। উপজেলার মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ডিলার পয়েন্টে ভোররাত থেকেই সার সংগ্রহের জন্য কৃষকেরা জড়ো হতে থাকেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, রোববার মধ্যরাত থেকে অনেক কৃষক সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

সোমবার বেলা ১১টা পর্যন্ত সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে শতাধিক বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

ডিলার মতিয়ার রহমানের দাবি, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সার বিতরণ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যান। এ সময়ের মধ্যেই অপেক্ষমাণ কৃষকেরা গুদাম থেকে সার নিয়ে যান বলে জানান তিনি।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল হাসান বলেন, তিনি বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। একটি বিক্রয়কেন্দ্রে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রশাসনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও মাঠে কাজ করেন।

রৌমারীর ঘটনার পাশাপাশি একই জেলার ভূরুঙ্গামারীতেও সারের দাবিতে উত্তেজনা তৈরি হয়। উপজেলার পাটেশ্বরী ব্রিজপাড় এলাকায় বিএডিসির এক ডিলার সার বিতরণ শুরু করলে সেখানে বিপুলসংখ্যক কৃষক জড়ো হন। সার নিতে আসা কৃষকেরা খোলাবাজারে সার বিক্রির দাবি জানান। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে অবরুদ্ধ করে রাখেন।

খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। খোলাবাজারে সার বিক্রির আশ্বাস দেওয়া হলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং অবরোধ তুলে নেন কৃষকেরা।

রাজশাহীর পুঠিয়াতেও সারের জন্য কৃষকদের ক্ষোভ সড়কে গড়ায়। সোমবার উপজেলার বানেশ্বর এলাকায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দুই পাশে যানবাহনের চাপ তৈরি হয়।

কৃষকদের অভিযোগ, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় চলছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। কেউ কেউ ভোর থেকে দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে কিছু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করেন তারা।

এক কৃষকের ভাষ্য, নির্ধারিত দামে সার পাওয়ার আশায় সকাল থেকে অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে কৃষকেরা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং মহাসড়কে অবস্থান নেন।

আরেক কৃষকের অভিযোগ, ডিলার পর্যায় থেকে সার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং পরে সেই সার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে স্থানীয় সার বিক্রেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পরে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমান ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি অসাধু সার বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এবং নির্ধারিত দামে দ্রুত সার সরবরাহের আশ্বাস দিলে কৃষকেরা অবরোধ তুলে নেন। এরপর দুপুরের পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

লালমনিরহাটেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সদর উপজেলার ফকিরের তকেয়া এলাকায় রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে সার সরবরাহ বাড়ানো ও কথিত সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। সোমবার বেলা ১১টার দিকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির কারণে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহন আটকা পড়ে।

আন্দোলনরত কৃষকেরা অভিযোগ করেন, সরকারি বরাদ্দের কথা থাকলেও বাস্তবে প্রয়োজনের সময় তারা পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন না। আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার না পাওয়ায় জমিতে সময়মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। এতে ফলন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কৃষকদের মধ্যে।

খবর পেয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হলে প্রায় এক ঘণ্টা পর কৃষকেরা সড়ক ছেড়ে দেন।

লালমনিরহাট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ কে এম মমিনুল হক দাবি করেন, জেলায় সারের সংকট নেই। তবে কৃষকদের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত সার বরাদ্দের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এর আগেও একই দাবিতে জেলার মহেন্দ্রনগর বাজার এলাকায় কৃষকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছিলেন।

এদিকে সারের বাজারে অনিয়ম ঠেকাতে প্রশাসনিক অভিযানও চলছে। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় দুটি সার বিক্রয়কেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর দুই ডিলারকে মোট ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পরিদর্শনে ক্যাশমেমো ব্যবহার না করা, মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা এবং রেজিস্টারে অসংগতি পাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক ডিলারকে ১০ হাজার টাকা এবং অপর ডিলারকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সার বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে ডিলারদের সতর্ক করা হয়েছে।

অন্যদিকে মাগুরার শ্রীপুরে অবৈধভাবে মজুত করা ৩২৮ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনা পরিস্থিতির আরেকটি দিক সামনে এনেছে। উপজেলার আমলসার বাজারে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের অভিযানে তিনটি স্থান থেকে এসব সার জব্দ করা হয়। পরে এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আমন মৌসুমে সারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এই সময়ে সরবরাহব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে অনিয়ম, মজুতদারি কিংবা বিতরণে ধীরগতি দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর। বিশেষ করে ধানের জমিতে নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারলে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কৃষকদের ক্ষোভের পেছনে শুধু সার না পাওয়ার বিষয়টি নয়, নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়েও অনিশ্চয়তা কাজ করছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কিংবা বাজারে বেশি দামে সার কেনার বাধ্যবাধকতা তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে। ফলে কোনো কোনো এলাকায় সেই ক্ষোভ তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে রূপ নিচ্ছে।

তবে সারের সংকটের অভিযোগের বিপরীতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার বক্তব্য হলো, অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোথাও সরবরাহে সাময়িক জটিলতা দেখা দিলে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

কৃষি মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শুধু সার বরাদ্দ বাড়ানোই নয়, বরাদ্দকৃত সার সঠিক সময়ে ও নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের হাতে পৌঁছানোও জরুরি। ডিলার পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি জোরদার করা না হলে সংকটের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত কৃষক যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার পান, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রৌমারীতে গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক। কারণ কৃষকের ন্যায্য দাবির সঙ্গে এমন আইনভঙ্গের ঘটনা এক করে দেখার সুযোগ নেই। কৃষকের সার পাওয়ার অধিকার যেমন নিশ্চিত করা দরকার, তেমনি সরকারি বা বেসরকারি গুদাম ভাঙচুর কিংবা জোর করে পণ্য নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও প্রতিরোধ করা জরুরি। প্রশাসনের দায়িত্ব হবে একদিকে কৃষকের প্রয়োজন মেটানো, অন্যদিকে বিতরণব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে সারের দাবিতে কৃষকদের বিক্ষোভ পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করছে। আমন মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন যেন সার সরবরাহের জটিলতায় বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য দ্রুত মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই এবং কার্যকর সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃষকের জমিতে প্রয়োজনের সময়ে সার পৌঁছাতে পারলেই এসব উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত