প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরে আইনজীবী সমিতিতে নবীন আইনজীবীদের ভর্তি ফি এবং সদস্যপদসংক্রান্ত নিয়ম নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায় এবং ভবিষ্যতে ভোটাধিকার চাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে মুচলেকা নেওয়ার অভিযোগ তুলে রংপুর আইনজীবী সমিতির বিরুদ্ধে মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন একদল নবীন আইনজীবী। এ সময় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিনকে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
সোমবার রাত ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত নগরীর আদালতপাড়ায় রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে এই কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। তাদের অভিযোগ, পেশাজীবনে প্রবেশের শুরুতেই নবীন আইনজীবীদের ওপর এমন কিছু আর্থিক ও প্রশাসনিক শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের কাছে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন, প্রচলিত বিধি অনুযায়ীই এতদিন ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং নবীনদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত ফি ছাড়াই সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া নবীন আইনজীবীদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভর্তি ফি। তাদের ভাষ্য, আগে রংপুর আইনজীবী সমিতিতে নবীন আইনজীবীদের সদস্যপদের জন্য ভর্তি ফি ছিল ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে বয়সের ভিত্তিতে সেই ফি ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সদ্য বার কাউন্সিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পেশাজীবন শুরু করতে যাওয়া আইনজীবীদের জন্য এই ব্যয় বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
নবীন আইনজীবী আসমিন ফারহা আঁখি বলেন, পেশায় প্রবেশের সময় একজন তরুণ আইনজীবীর সামনে এমনিতেই নানা ধরনের আর্থিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ থাকে। সেখানে বয়সের ভিত্তিতে কয়েক গুণ বেশি ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হলে অনেকের পক্ষেই সদস্যপদ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার অভিযোগ, শুধু ভর্তি ফির বিষয়টিই নয়, ৩৫ বছরের বেশি বয়সী আইনজীবীদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে লিখিত মুচলেকা নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, ওই মুচলেকায় ভবিষ্যতে ভোটাধিকারের আবেদন না করার বিষয়টি উল্লেখ থাকে। তাদের কাছে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ আইনজীবীদের সংগঠন হিসেবে সমিতির কার্যক্রমে সদস্যদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বলে তারা মনে করছেন।
আসমিন ফারহা আঁখির ভাষায়, আইনচর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত একটি আইনজীবী সমিতিতে যদি সদস্যদের ভোটাধিকার সীমিত করার মতো শর্ত থাকে, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের দাবি, বিতর্কিত নিয়ম ও মুচলেকার ব্যবস্থা বাতিল না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার কথা ভাবছেন তারা।
আন্দোলনকারীদের আরেকজন আইনজীবী আরিফুর রহমান জানান, ২৬তম ব্যাচে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১০৮ জন নবীন আইনজীবী রংপুর আইনজীবী সমিতিতে সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে ৪৫ জনকে সাধারণ সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা হলেও ৬৩ জনকে সহযোগী সদস্য হিসেবে ভর্তির সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার অভিযোগ, একই পেশায় প্রবেশ করা আইনজীবীদের মধ্যে বয়সের ভিত্তিতে ভিন্ন ধরনের আর্থিক শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সহযোগী সদস্যপদের মাধ্যমে তাদের অধিকারও সীমিত করা হচ্ছে বলে আন্দোলনকারীরা মনে করছেন। তাদের দাবি, দেশের অন্যান্য আইনজীবী সমিতিতে এমন ব্যবস্থা নেই। তাই রংপুর আইনজীবী সমিতির এ ধরনের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নবীন আইনজীবীদের বক্তব্যে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—তারা শুধু বর্তমান ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি করছেন না, বরং ভবিষ্যতে তাদের পেশাগত অধিকার ও সমিতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়েও উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, একজন আইনজীবী পেশায় প্রবেশের শুরুতেই যদি সদস্যপদের ধরন এবং ভোটাধিকার নিয়ে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে পেশাগত প্রতিনিধিত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে আন্দোলনকারীদের দাবির বিপরীতে রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, সমিতির বর্তমান নিয়মাবলি ২০০৩ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই বিধান অনুসরণ করেই এতদিন সদস্যপদ ও ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। অর্থাৎ বর্তমান নিয়ম কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বা সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি করা হয়নি বলে তার বক্তব্য।
তবে নবীন আইনজীবীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত ভর্তি ফি নিয়ে ইতোমধ্যে সমিতির পক্ষ থেকে নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আফতাব উদ্দিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নবীন আইনজীবীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত ফি ছাড়াই তাদের সদস্যপদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মুচলেকার বিষয়েও তিনি জানান, এ বিষয়ে এককভাবে তার সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে সমিতির অন্যান্য সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে নবীন আইনজীবীদের অভিযোগের বেশ কিছু বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর আগে সোমবার রাতের অবস্থান কর্মসূচিতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা সমিতির সাধারণ সম্পাদককে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের একজন বিকাশ চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, মঙ্গলবার অতিরিক্ত ভর্তি ফি এবং মুচলেকা ছাড়া সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে তাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু আশ্বাসে বিষয়টির সমাধান হবে না বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করতে হবে। অন্যথায় তারা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এমনকি দাবি বাস্তবায়ন না হলে আমরণ অনশনের মতো কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
রংপুরের এই ঘটনা আইনজীবী পেশায় প্রবেশের প্রক্রিয়া, পেশাজীবী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিধি এবং সদস্যদের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একজন নবীন আইনজীবীর জন্য বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করা দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের ফল। এই পর্যায়ে সদস্যপদ গ্রহণের খরচ এবং সংগঠনের কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়টি তাদের পেশাগত ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অন্যদিকে আইনজীবী সমিতির নিজস্ব বিধিমালা ও সাংগঠনিক কাঠামোর বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন আগে প্রণীত কোনো বিধি সময়ের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে কোনো বিধানের প্রয়োগ যদি নতুন সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য বা অধিকার সংকোচনের অনুভূতি তৈরি করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা পর্যালোচনার সুযোগ থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান। নবীন আইনজীবীরা যেমন তাদের আর্থিক চাপ ও সদস্য অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তেমনি সমিতির পক্ষ থেকেও বিদ্যমান বিধিমালা অনুসরণের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ফলে উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানে পৌঁছানোই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, বিষয়গুলো নিয়ে সমিতির অভ্যন্তরে আলোচনা হবে। অন্যদিকে নবীন আইনজীবীরা তাদের দাবির বাস্তবায়ন দেখতে চাইছেন। এখন সমিতির পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে এই বিরোধ কোন পথে এগোয়। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হলে তা নবীন আইনজীবীদের উদ্বেগ যেমন কমাতে পারে, তেমনি সমিতির অভ্যন্তরীণ পরিবেশও স্বাভাবিক রাখার সুযোগ তৈরি হবে।