প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে কাঁচামালের সরবরাহ সহজ করতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের বর্জ্য সুতা বা ওয়েস্ট ইয়ার্ন আমদানির সুযোগ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্তও আরোপ করা হয়েছে। আমদানিকৃত কাঁচামালের অপব্যবহার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আমদানির আগে প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে। শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য সম্পূর্ণ রপ্তানি হওয়ার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেই গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হবে।
দেশীয় স্পিনিং শিল্পের আপত্তি এবং তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার খাতের আমদানি সুবিধার দাবির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য আনার লক্ষ্যেই নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে একদিকে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা যেন স্থানীয় বাজারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়েও নজরদারির সুযোগ থাকবে।
এনবিআরের ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা আদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস কোড ৫৫০৫, ৫৫০৬ ও ৫২০৭-এর আওতাধীন ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের বর্জ্য সুতা বন্ড সুবিধায় আমদানি করা যাবে। তবে এই সুবিধা সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত নয়। কেবল রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) অথবা বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর সদস্যভুক্ত রপ্তানিমুখী কারখানা হতে হবে। আমদানির আগে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ নিঃশর্ত এবং অব্যাহতি-অযোগ্য ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল নির্ধারিত রপ্তানিমুখী উৎপাদনেই ব্যবহার করা নিশ্চিত করা। আমদানিকৃত বর্জ্য সুতা ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদনের পর তা সম্পূর্ণ রপ্তানি হলে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হবে। ফলে কাঁচামাল আমদানির সময় সরকার রাজস্ব ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি পরবর্তী ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার সুযোগ পাবে।
বর্জ্য সুতা তুলনামূলক কম দামের কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পোশাক ও বস্ত্রপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যমূল্যের পোশাক, মোজা, নিটওয়্যারসহ বিভিন্ন টেক্সটাইল পণ্যের উৎপাদনে এ ধরনের সুতার চাহিদা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে পণ্য সরবরাহের প্রতিযোগিতায় থাকা রপ্তানিকারকদের জন্য কাঁচামালের দাম উৎপাদন ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে তুলনামূলক কম দামের বিকল্প কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগকে তারা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
রপ্তানিমুখী পোশাক ও নিটওয়্যার খাতের সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ওয়েস্ট ইয়ার্ন আমদানির সুযোগ চেয়ে আসছিল। তাদের যুক্তি ছিল, স্থানীয় বাজারে সব সময় প্রয়োজনীয় মান ও দামের বর্জ্য সুতা পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে পাওয়া কাঁচামালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি হতে পারে। এর ফলে রপ্তানি আদেশের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশীয় কারখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পিছিয়ে পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের ক্রেতাদের কাছ থেকে দামের চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও পরিবহন খরচের প্রভাবের মধ্যে কাঁচামালের ব্যয় কমানোর বিষয়টি রপ্তানিকারকদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, নির্দিষ্ট শর্তে ওয়েস্ট ইয়ার্ন আমদানির সুযোগ থাকলে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দামের বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা কিছুটা সহজ হবে।
তবে এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয় দেশীয় স্পিনিং শিল্প। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন বা বিটিএমএর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, আমদানির সুযোগ অতিরিক্ত বিস্তৃত হলে তুলনামূলক কম দামের বিদেশি বর্জ্য সুতা স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করতে পারে। এতে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন ও বিক্রির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
দেশের স্পিনিং খাত পোশাকশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুতা সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতের বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে দেশীয় শিল্পের বড় একটি অংশ যুক্ত। তাই আমদানির সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার দাবি রয়েছে।
এ অবস্থায় এনবিআরের নতুন সিদ্ধান্তকে দুই খাতের মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সরাসরি শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ না দিয়ে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত আরোপ করায় বন্ড সুবিধার কাঁচামাল নির্দিষ্ট উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্য স্থানীয় বাজারে চলে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
ওয়েস্ট ইয়ার্ন আমদানির বিষয়টি নিয়ে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএর মধ্যে মতপার্থক্যের পর একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও সুপারিশ বিবেচনার পরই এনবিআর নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি নীতিগত সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তবে সিদ্ধান্তের বাস্তব ফল নির্ভর করবে এর প্রয়োগ ও তদারকির ওপর। ব্যাংক গ্যারান্টি জমা নেওয়া হলেও আমদানিকৃত কাঁচামাল কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, উৎপাদিত পণ্য যথাযথভাবে রপ্তানি হচ্ছে কি না এবং বন্ড সুবিধার কোনো অপব্যবহার হচ্ছে কি না—এসব বিষয় কার্যকরভাবে নজরদারি করতে হবে। তদারকিতে দুর্বলতা থাকলে একদিকে সরকারি রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পের উদ্বেগও বাড়তে পারে।
এনবিআরের আদেশে বলা হয়েছে, কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এর ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে আদেশ জারির আগে যেসব বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নতুন সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
নীতিগতভাবে নতুন এই সুবিধা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহের একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছে। তবে এর পাশাপাশি স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারী শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পোশাক খাতের রপ্তানি সক্ষমতা যেমন সাশ্রয়ী কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে, তেমনি দেশীয় স্পিনিং শিল্পের টিকে থাকা শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ বা backward linkage শক্তিশালী রাখার জন্যও প্রয়োজনীয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রপ্তানিকারকদের কাঁচামালের প্রয়োজন এবং দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে আমদানি নীতির পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে বন্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এতে প্রকৃত রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সুবিধা পাবে, আবার আমদানির সুযোগকে কেন্দ্র করে অনিয়মের সম্ভাবনাও কমানো সম্ভব হবে।
দেশের তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। ক্রেতাদের মূল্যচাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় শিল্পটির জন্য প্রতিটি কাঁচামালের ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে স্থানীয় স্পিনিং শিল্পের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ওয়েস্ট ইয়ার্ন আমদানির নতুন সিদ্ধান্তের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে—কীভাবে এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা যায় তার ওপর।
এনবিআরের নতুন নীতির ফলে রপ্তানিকারকরা কাঁচামাল সংগ্রহে কতটা সুবিধা পান এবং স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর ওপর এর প্রভাব কতটা পড়ে, তা আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। সরকারের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা এবং বন্ড সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।