হামের টিকায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
হামের টিকায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে চলমান হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিশুদের টিকাদানে সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগের কারণে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি কর্মসূচিতে সারাদেশে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টিকা গ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় টিকাদানের হার ১০৯ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

দেশে চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয় সরকার। প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়ার পর প্রথম ধাপে ৫ এপ্রিল দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো হয়।

দ্বিতীয় ধাপে ১২ এপ্রিল দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন এলাকায় হাম-রুবেলার টিকাদান শুরু হয়। এসব সিটি করপোরেশনের মধ্যে ছিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ। এরপর তৃতীয় ধাপে ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে একযোগে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়। দেশব্যাপী এই কর্মসূচি এখনও চলমান রয়েছে।

তবে বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নতুন করে আরও বড় পরিসরে টিকাদান কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে ব্যাপকভাবে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার নতুন ক্যাম্পেইন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে টিকা কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকা কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। শিশুদের মধ্যে এর বিস্তার দ্রুত ঘটতে পারে। ফলে প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর আক্রান্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। এ কারণেই ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও নগর এলাকায় জরুরি এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-রুবেলা টিকার সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন বিভাগে টিকাদানের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু এই টিকার আওতায় এসেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৮ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪ জন এবং ঢাকা বিভাগে ৪৯ লাখ ১৯ হাজার ৯১৩ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে।

এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ২২ লাখ ১৩ হাজার ১৯৭ জন, রংপুর বিভাগে ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৮ জন, খুলনা বিভাগে ১৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৯১৬ জন, সিলেট বিভাগে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮০৫ জন এবং বরিশাল বিভাগে ১১ লাখ ১০ হাজার ৬৯৮ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

শহরাঞ্চলেও টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় বিপুলসংখ্যক শিশু হাম-রুবেলার টিকা গ্রহণ করেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮৮ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪ লাখ ১৮ হাজার ৯৭২ জন শিশু টিকা পেয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা পেয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৭০ জন শিশু।

এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ২ লাখ ৬ হাজার ৯২৭ জন, খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯৬ হাজার ৭৯২ জন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৮৩ হাজার ৬৯৭ জন এবং রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৮২ হাজার ২৫৩ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা নিয়েছে।

সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে বরিশালে ৪৪ হাজার ১১৯ জন, কুমিল্লায় ৪৮ হাজার ৬৪৩ জন, ময়মনসিংহে ৬২ হাজার ৩০৫ জন, রাজশাহীতে ৬৩ হাজার ৫৯ জন এবং সিলেটে ৭২ হাজার ৩৪৯ জন শিশু টিকার আওতায় এসেছে। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, নগর ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাপকভাবে পরিচালিত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান জানিয়েছেন, শিশুদের টিকা দেওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে ব্যাপকভাবে শিশুদের হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেটিকে সরকারের বাড়তি তৎপরতা হিসেবে দেখছেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন করে বড় পরিসরে টিকাদান কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো কোনো শিশুকে টিকা গ্রহণ থেকে বাদ না দেওয়া। অর্থাৎ ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে টিকা দেওয়া হলেও কর্মসূচি থামিয়ে না দিয়ে আরও বেশি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্বও রয়েছে। কারণ হাম-রুবেলার মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে টিকাদানের মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা বাড়ানো সম্ভব। একটি এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার আওতায় না এলে রোগের বিস্তার অব্যাহত থাকার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুধু নির্ধারিত সংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়াই নয়, প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা জরুরি।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকাদানের হার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়াকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব পরিবার এখনও শিশুদের টিকা করাননি, তাদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে সহজে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের শনাক্ত করা, অভিভাবকদের টিকার বিষয়ে অবহিত করা এবং নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। নতুন ক্যাম্পেইন সফল করতে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য শুধু মোট কতজন টিকা নিয়েছে, সেই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। কোন এলাকায় কত শিশু বাদ পড়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের পরিস্থিতি কেমন এবং টিকার আওতায় আসা শিশুদের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হয়েছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের নতুন কর্মসূচিতে টিকা গ্রহণের পাশাপাশি বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

সারাদেশে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুর টিকা গ্রহণ অবশ্যই বড় একটি অর্জন। তবে দেশে এখনও হাম প্রাদুর্ভাব থাকার প্রেক্ষাপটে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের নতুন কর্মসূচির লক্ষ্য সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকাদানের আওতা আরও বাড়ানো এবং কোনো শিশুকে সুরক্ষার বাইরে না রাখা।

শিশুদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়তা এবং সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগ—এই তিনটির সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশু টিকা পেলেও হাম প্রতিরোধে কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ দেখাচ্ছে, রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনের কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে কতটা কার্যকরভাবে অবশিষ্ট শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায় এবং হাম সংক্রমণ কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত