নবম পে-স্কেলে কমছে বাড়িভাড়া ভাতার হার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৩ বার
নবম পে-স্কেলে কমছে বাড়িভাড়া ভাতার হার

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও গ্রেডভেদে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান ২০১৫ সালের পে-স্কেলের তুলনায় নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ কমলেও মূল বেতন বড় অঙ্কে বাড়ায় বাস্তবে প্রাপ্ত বাড়িভাড়া ভাতার টাকার পরিমাণ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ ও প্রত্যাশা রয়েছে। বেতন বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতার পরিবর্তন কর্মজীবীদের মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাবেও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে বাড়িভাড়া ভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের মোট মাসিক প্রাপ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এর হার কমানোর প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এই হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ একই গ্রেডের একজন সরকারি চাকরিজীবীর মূল বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ হিসেবে প্রাপ্তি আগের তুলনায় কম হবে।

ঢাকার বাইরে অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলায় বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্যান্য এলাকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিদ্যমান ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতার পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ কমলেও মূল বেতন বৃদ্ধির কারণে মোট অর্থের হিসাবে ভাতা আগের তুলনায় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ নিয়ে এই পরিবর্তনগুলো সামনে এসেছে। গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়। সভার কার্যবিবরণী সূত্রে নতুন কাঠামোর বিভিন্ন প্রস্তাবের তথ্য জানা গেছে।

নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধির হার গ্রেডভেদে ভিন্ন রাখা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে বাড়িভাড়া ভাতার হার শতাংশের হিসাবে কমলেও মূল বেতন যে হারে বাড়বে, তাতে সংশ্লিষ্ট ভাতার প্রকৃত টাকার অঙ্ক বৃদ্ধি পাবে।

তবে নতুন বেতন কাঠামোয় শুধু বাড়িভাড়া ভাতাই পরিবর্তিত হচ্ছে না; বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রেও গ্রেডভিত্তিক পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তুলনামূলকভাবে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেড যত উঁচু হবে, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার তত কম হতে পারে।

নতুন কাঠামোয় আগের মতোই মোট ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাবও বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় বেতন কমিশন প্রথম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে সচিব কমিটির সুপারিশে তা কমিয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৮ম ও ৯ম গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার নিয়েও পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবে এসব গ্রেডে ১০৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও সচিব কমিটির সুপারিশে তা কমিয়ে ১০০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে। পরবর্তী দুই ধাপে বাকি অংশ সমন্বয় করা হবে। এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ সুবিধা একসঙ্গে না পেলেও পর্যায়ক্রমে তা কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বেতন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা কার্যকরের ক্ষেত্রে আলাদা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে মূল বেতন বৃদ্ধির সুবিধা এবং বিভিন্ন ভাতার কার্যকর হওয়ার সময়ের মধ্যে ব্যবধান থাকবে।

নতুন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীরা মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরিজীবীরা মাসে ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পেতে পারেন। বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় এই পরিবর্তন কর্মজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পেনশনারদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী পেনশনারদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বয়স্ক পেনশনারদের চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এই ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

এবারের প্রস্তাবিত কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মোবাইল ভাতার বিষয়টিও নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের চাকরিজীবীদের মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ১ম থেকে ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মাসে ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

কর্মজীবীদের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আরও কয়েকটি ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ রাখা হয়েছে। এসব ভাতা মূল বেতনের তুলনায় ছোট অঙ্কের হলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারি চাকরিজীবীদের মোট প্রাপ্য আয়ে এর প্রভাব পড়বে।

তবে সব ভাতার হার বাড়ানো হচ্ছে না। বাংলা নববর্ষ ভাতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থার তুলনায় কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন পে-স্কেল ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল বেতন এবং বিভিন্ন ভাতার সমন্বিত প্রভাব। একদিকে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব থাকায় মাসিক আয় বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে কিছু ভাতার শতাংশ কমানো এবং কয়েকটি ভাতা কার্যকরের সময় পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তাদের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে বাড়িভাড়া ভাতার ক্ষেত্রে শতাংশ কমার বিষয়টি প্রথম নজরে নেতিবাচক মনে হলেও মূল বেতন বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত টাকার অঙ্কে ভাতা বাড়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে একজন চাকরিজীবীর হাতে শেষ পর্যন্ত কত টাকা বাড়বে, তা নির্ভর করবে তার গ্রেড, নতুন মূল বেতন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার জন্য নির্ধারিত বাড়িভাড়া ভাতার হারের ওপর।

নতুন কাঠামোর এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়বে। ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর এবং পরবর্তী সময়ে আনুষঙ্গিক ভাতা চালুর মাধ্যমে সরকার বেতন কাঠামোর আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একদিকে মূল বেতন বৃদ্ধির বড় প্রস্তাব রয়েছে, অন্যদিকে বাড়িভাড়া ও কয়েকটি অন্যান্য ভাতার হারে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন কাঠামোর বাস্তব প্রভাব নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে ভাতা পুনর্বিন্যাস হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মাসিক আয়, অবসর-পরবর্তী সুবিধা এবং সামগ্রিক আর্থিক পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত