প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের কারণে পাবনার নাজিরগঞ্জ ও রাজবাড়ীর ধাওয়াপাড়া নৌরুটে টানা ১১ দিন ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে যানবাহন পারাপার বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রী, পরিবহন চালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। নদী পারাপারে বাধ্য হয়ে অনেক মানুষকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ট্রলার ও স্পিডবোট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় ও খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে উত্তাল পদ্মায় ঝুঁকি নিয়ে পারাপারের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া ফেরি সার্ভিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমএন আল শিবলী জানিয়েছেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে এই নৌপথে যানবাহন পারাপার পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পদ্মার প্রবল স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল নিরাপদ না হওয়ায় কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া নৌরুটটি পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগপথ। এই পথ ব্যবহার করলে অনেক পরিবহনকে দীর্ঘ ঘুরপথ এড়িয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব কমিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ পাওয়া যায়। ফলে সময় ও জ্বালানি খরচ দুটোই সাশ্রয় হয়। কিন্তু ফেরি বন্ধ থাকায় এখন সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার সকালে সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে ফেরি ‘ক্যামেলিয়া’ অলস অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব স্থানে যানবাহন ওঠানামা, যাত্রীদের ব্যস্ততা ও পরিবহনকর্মীদের কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়, সেখানে ফেরি বন্ধ থাকায় অনেকটাই স্থবিরতা নেমে এসেছে। অন্যদিকে নদীর কূল ঘেঁষে ছোট ছোট ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে মানুষ পদ্মা পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উত্তাল নদীতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি যাত্রী নিয়ে ছোট নৌযান চলাচল করছে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। ফেরি বন্ধ থাকায় যাদের জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হতে হচ্ছে, তাদের অনেকেই ঝুঁকি বিবেচনা করেও বিকল্প নৌযান ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেলসহ যাত্রীদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া রুটের ফেরি সার্ভিস ২০২৩ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছ থেকে বিআইডব্লিউটিসি অধিগ্রহণের পর নতুনভাবে চালু হয়। তখন ‘কপোতি’ ও ‘ক্যামেলিয়া’ নামে দুটি ফেরি দিয়ে দিনে চারবার যানবাহন পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ‘কপোতি’ ফেরিটি প্রায় তিন মাস ধরে বিকল অবস্থায় রয়েছে। ফলে কার্যত ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরিটির ওপরই পুরো রুটের যানবাহন পারাপারের দায়িত্ব ছিল।
কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নাজিরগঞ্জ থেকে ধাওয়াপাড়া যেতে ফেরির প্রায় এক ঘণ্টা ১০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু পদ্মায় স্রোত বেড়ে যাওয়ার পর একই পথ অতিক্রম করতে সময় লেগেছে আড়াই ঘণ্টারও বেশি। এতে ফেরির ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছিল। পাশাপাশি তীব্র স্রোতের মধ্যে ফেরি পরিচালনা করতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছিল। এসব বিষয় বিবেচনা করে গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফেরি বন্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষ ও পরিবহন চালকেরা। স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, এই নৌপথটি তাদের জন্য শুধু একটি নদী পারাপারের ব্যবস্থা নয়, বরং সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফেরি বন্ধ থাকায় এখন তাদের বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে। কেউ লালন শাহ সেতু ঘুরে গন্তব্যে যাচ্ছেন, আবার কেউ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট ব্যবহার করে আরিচা হয়ে পাবনার কাজিরহাটের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিকল্প এসব পথে অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে হওয়ায় পরিবহন মালিক ও চালকদের জ্বালানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগায় ব্যবসায়িক ব্যয়ও বাড়ছে। যাত্রীদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে ভাড়া ও যাত্রার সময়—দুই দিকেই চাপ তৈরি হচ্ছে।
নিয়মিত এই নৌপথে চলাচলকারী কবীর হোসেন বলেন, শুরু থেকেই নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া নৌপথের প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তার অভিযোগ, এই রুট থেকে সরকার রাজস্ব পেলেও যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। ফেরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন সাধারণ মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে বিকল্প নৌযানে নদী পার হতে হচ্ছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে নাজিরগঞ্জ ঘাট থেকে ধাওয়াপাড়া ঘাটে একটি মোটরসাইকেল ও দুই যাত্রীর ফেরি ভাড়া ২৫০ টাকা। বর্তমানে ফেরি বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেল পারাপারের সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে ট্রলার ব্যবহার করলে একজন যাত্রীকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং মোটরসাইকেলের জন্য অতিরিক্ত ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যাতায়াতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
ফেরি চলাচল বন্ধের প্রভাব শুধু যাত্রী ও চালকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নাজিরগঞ্জ ঘাটের আশপাশে থাকা হোটেল, খাবারের দোকান, চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাধারণত ফেরিতে আসা-যাওয়া করা যাত্রী ও চালকদের ওপর নির্ভরশীল। যানবাহন পারাপার বন্ধ থাকায় এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বেচাকেনাও কমে গেছে।
নাজিরগঞ্জ ঘাটের একটি স্থানীয় হোটেলের মালিক আব্দুল আলীম বলেন, ঘাট চালু থাকলে যাত্রী ও চালকদের কারণে ব্যবসা ভালো হয়। কিন্তু ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে তাদের বেচাকেনাও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে ফেরি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও তিনি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই নৌরুটে পর্যাপ্ত সক্ষমতার ফেরি দেওয়ার দাবি থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের মতে, পদ্মার মতো বড় নদীতে মৌসুমি স্রোত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শক্তিশালী ফেরি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকা দরকার। একটি ফেরি দীর্ঘদিন বিকল থাকা এবং অপর ফেরিটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রুটটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে নদীপথে ফেরি চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তের পেছনে যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তীব্র স্রোতের মধ্যে ফেরি পরিচালনা করে দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে ফেরি বন্ধ রাখা কর্তৃপক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে।
এ অবস্থায় স্থানীয় যাত্রী ও পরিবহন চালকদের দাবি, নদীর স্রোত ও নৌযান চলাচলের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে নিরাপদ সময় নির্ধারণের পাশাপাশি সক্ষম ফেরি দ্রুত এই রুটে যুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকা ফেরিটি মেরামত করে সচল করা গেলে একটি ফেরির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। এতে ভবিষ্যতে সাময়িকভাবে একটি ফেরি বন্ধ হলেও পুরো রুট অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া নৌরুট সচল থাকা শুধু স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের জন্য নয়, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের পণ্যবাহী যানবাহন, ব্যক্তিগত পরিবহন ও সাধারণ যাত্রীদের চলাচল এই পথের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ সময় ফেরি বন্ধ থাকলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে বৃহত্তর পরিবহন ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
পদ্মার তীব্র স্রোত কখন কমবে এবং কবে নাগাদ ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। ফলে আপাতত বিকল্প পথে চলাচল এবং ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌযানে নদী পারাপারই অনেকের একমাত্র ভরসা হয়ে আছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদভাবে ফেরি সার্ভিস চালু করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় রুটটি বন্ধ না থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।