প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা থামছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। নতুন করে এই তিন শিশুর মৃত্যুর ফলে সিলেট বিভাগে চলতি বছরে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৮ জনে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫১৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ফলে একদিকে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে হাসপাতালে নতুন রোগীর চাপও অব্যাহত রয়েছে।
হাম উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া তিন শিশুর নাম সামিহা, পরশ ও ইলমা বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তাদের মৃত্যুর খবরে স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিশুদের অসুস্থতা ও চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে ছুটে এলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। একের পর এক শিশুর মৃত্যুতে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নতুন করে কারও শরীরে হাম শনাক্ত হয়নি। তবে একই সময়ে ১৯৩ জন সন্দেহভাজন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ পরীক্ষায় নতুন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত না হলেও হাম বা হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে চিকিৎসাসেবা দিতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় মোট ১ হাজার ৪৪ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, হাম ও হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর সবগুলোই পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম হিসেবে গণ্য করা হয়নি। এ পর্যন্ত মৃত শিশুদের মধ্যে ১০ জনের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য মৃত্যুগুলো সন্দেহভাজন বা হামসদৃশ উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর হামসদৃশ উপসর্গ থাকলেই পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি ব্যবস্থায় নিশ্চিত হাম এবং সন্দেহভাজন হাম বা উপসর্গের হিসাব আলাদাভাবে রাখা হয়। ফলে মৃত্যুর মোট সংখ্যা প্রকাশের সময় নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন—দুই ধরনের তথ্যকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সিলেট বিভাগে চলমান পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা। বর্তমানে ৫১৮ জন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর আগের দিনও শত শত নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে যুক্ত হওয়ায় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপ কমার সুযোগ খুব বেশি তৈরি হচ্ছে না।
সিলেটের পাশাপাশি বিভাগের অন্যান্য জেলাতেও হাম পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ নজরদারি করছে। চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার—চার জেলাতেই নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
হামের মতো সংক্রামক রোগে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর, শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া কিংবা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে উপসর্গ গুরুতর হলে ঘরে বসে চিকিৎসা না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন চিকিৎসকেরা।
একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে আলাদা রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে অন্যদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি পরিবারের একজন শিশু আক্রান্ত হলে তার ভাইবোনসহ আশপাশের শিশুদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
সিলেটে হাম পরিস্থিতি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হচ্ছে শিশুদের মৃত্যুর ধারাবাহিকতা। একদিনে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর খবর পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, শিশুর পুষ্টি ও পরিচর্যার দিকে নজর দেওয়া এবং স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
চলমান পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতেও রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হলে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর চাপ বাড়ে। শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল, কারণ অসুস্থতার সঙ্গে অপুষ্টি বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা যুক্ত হলে তাদের অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে নিশ্চিত হাম রোগী এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে নিয়মিত পরীক্ষার পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন এলাকায় নতুন রোগী বেশি, কোন বয়সের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে—এসব তথ্য ভবিষ্যৎ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।
গত কয়েক মাসে সিলেট বিভাগে হাম নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়া-কমার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৯৩ জন সন্দেহভাজন রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ওপর চাপ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে নতুন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত না হওয়াও নজরদারি ও পরীক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
শিশুদের এমন অসুস্থতার সময়ে পরিবারের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে একটি শয্যার পাশে অপেক্ষমাণ বাবা-মা কিংবা স্বজনদের কাছে সংখ্যার হিসাবের চেয়ে প্রিয় শিশুটির সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরাটাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। কিন্তু একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা সেই প্রত্যাশাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করছে।
সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ১৬৮ শিশুর মৃত্যুর তথ্য তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপরও একটি বড় চাপের ইঙ্গিত। একই সঙ্গে হাসপাতালে ৫১৮ রোগীর চিকিৎসাধীন থাকা এবং একদিনে ১৯৩ জন নতুন সন্দেহভাজন রোগীর ভর্তি হওয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করছে।
এ অবস্থায় রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবার পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি। শিশুদের উপসর্গকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করাই এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। সিলেটে হাম পরিস্থিতি কখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নির্ভর করবে রোগের বিস্তার, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের কার্যকারিতার ওপর।