খেলাপি ঋণে কিছুটা স্বস্তি, কমেছে অনুপাত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
খেলাপি ঋণে কিছুটা স্বস্তি, কমেছে অনুপাত

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। ঋণ বিতরণে অনিয়ম, দুর্বল যাচাই-বাছাই, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং দীর্ঘদিন ধরে ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা ক্রমেই বেড়েছে। এর মধ্যেই গত নয় মাসে শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের অনুপাতে কিছুটা কমার তথ্য সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে শ্রেণীকৃত ঋণের অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নয় মাসে অনুপাত কমেছে ২ দশমিক ৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।

তবে অনুপাত কমলেও ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখনো অত্যন্ত বড়। জুন শেষে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ফলে পরিসংখ্যানের দিক থেকে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও ব্যাংক খাতের মূল সংকট যে পুরোপুরি কাটেনি, তা স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের অনুপাত কমার পাশাপাশি ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ, আদায় বাড়ানো এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। ওই সময় ব্যাংক খাতের মোট ঋণের বিপরীতে শ্রেণীকৃত ঋণের অনুপাত ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে শ্রেণীকৃত ঋণের মোট পরিমাণ সামান্য বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের পরিমাণ বাড়ায় শ্রেণীকৃত ঋণের অনুপাত কমে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমেছে।

অর্থাৎ শুধু মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেখলে খুব বড় পরিবর্তন চোখে পড়ে না। বরং মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে—এটাই সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের প্রধান দিক। ব্যাংকিং খাতের জন্য এ প্রবণতা কিছুটা ইতিবাচক হলেও এটিকে স্থায়ী উন্নতি হিসেবে বিবেচনা করার আগে আরও সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এর অংশ হিসেবে আগে পুনঃতফসিল বা অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে আড়ালে থাকা ঋণের প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর হিসাব-নিকাশে আগে যেসব ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি পুরোপুরি প্রতিফলিত হতো না, সেগুলোও ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে এসেছে।

ব্যাংক খাতের এই হিসাব পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ খেলাপি ঋণ কম দেখানোর জন্য কোনো ঋণকে দীর্ঘদিন পুনঃতফসিল করা হলে কাগজে-কলমে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো মনে হতে পারে। কিন্তু ঋণগ্রহীতা প্রকৃতপক্ষে টাকা ফেরত দিতে সক্ষম কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার মূল সূচক। তাই প্রকৃত ঝুঁকি চিহ্নিত করে হিসাব প্রকাশ করা ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এককালীন প্রস্থান নীতি এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এসব নীতির উদ্দেশ্য একদিকে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সমাধানের সুযোগ তৈরি করা, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এসব সংস্কারের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হলে খেলাপি ঋণের অনুপাত আরও কমতে পারে।

তবে খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু পুনঃতফসিল বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। ঋণ বিতরণের সময় গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার প্রকৃতি, নগদ প্রবাহ এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে ঋণ নেওয়ার পর অর্থ কোথায় ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও ব্যাংকগুলোর পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকা প্রয়োজন। এসব জায়গায় দুর্বলতা থাকলে নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরির ঝুঁকি থেকেই যায়।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, অতীতে প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান ব্যাংক খাতের প্রকৃত সমস্যার পুরো চিত্র তুলে ধরেনি। তার মতে, ২০০৮ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২৪ সালে সরকারি হিসাবে তা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। পরে শ্বেতপত্রে প্রকৃত খেলাপি ও সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আনা এবং সংস্কারের মাধ্যমে দুর্বলতা দূর করা জরুরি। খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যাংক খাতের হিসাব পরিষ্কার করার উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো ব্যাংক যখন প্রকৃত ঋণঝুঁকি প্রকাশ করে, তখন তার মুনাফা, মূলধন এবং আর্থিক সূচকে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে। কিন্তু এই চাপের মধ্য দিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থান স্পষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে একটি বেশি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।

সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর মতে, ব্যাংক খাতের হিসাব পরিষ্কার করার প্রক্রিয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সঠিক ঋণ মূল্যায়ন এবং কার্যকর ঋণ আদায় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য সংস্কার কাঠামো জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের মানদণ্ড আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি হিসাবের ব্যবস্থার দিকেও এগোচ্ছে। এই পদ্ধতিতে সম্ভাব্য ঋণঝুঁকি আগে থেকেই হিসাবের মধ্যে আনার সুযোগ থাকে। ফলে কোনো ঋণ পুরোপুরি খেলাপি হওয়ার আগেই ব্যাংক তার সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

ব্যাংক খাতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণ আদায়ের কার্যকারিতা। বহু বছর ধরে খেলাপি থাকা ঋণের একটি বড় অংশ আদায় না হলে শুধু নতুন করে হিসাব শ্রেণীকরণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং ব্যবসায়িক কারণে সাময়িক সমস্যায় পড়া ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে পার্থক্য করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

খেলাপি ঋণের সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থার বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। ব্যাংকের ঋণ যদি ফেরত না আসে, তাহলে ব্যাংকের তারল্য ও মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে। তাই ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বর্তমান পরিসংখ্যানে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। তবে মোট শ্রেণীকৃত ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি থাকায় সংকটের গভীরতাও স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে এই অনুপাত কমার প্রবণতা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ করা।

এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব, ঋণ অনুমোদনে কঠোর যাচাই, নিয়মিত তদারকি, দ্রুত আদায় ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি যেসব অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং সম্ভব হলে অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও জরুরি।

আগামী মাসগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও অনুপাত কোন দিকে যায়, সেটিই হবে সংস্কার উদ্যোগের কার্যকারিতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের তথ্য ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের স্থায়িত্ব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দিতে পারে। যদি ঋণ আদায় বাড়ে, নতুন খেলাপি ঋণ কমে এবং ব্যাংকগুলো প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি যথাযথভাবে হিসাবের মধ্যে আনে, তাহলে বর্তমান পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

সব মিলিয়ে, গত নয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে আসা বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সামনে পথ এখনো দীর্ঘ। কয়েক লাখ কোটি টাকার শ্রেণীকৃত ঋণের বোঝা কমাতে কেবল পরিসংখ্যানের উন্নতি নয়, প্রয়োজন ঋণ ব্যবস্থাপনায় মৌলিক সংস্কার, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর আদায় ব্যবস্থা। ব্যাংক খাতের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করবে কতটা দ্রুত এই সংস্কারগুলো বাস্তবে কার্যকর হয় এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কতটা পুনর্গঠন করা যায় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত