প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখার কারণে ভারতের ওপর বড় ধরনের বাণিজ্যিক চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার বিধান থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। মঙ্গলবার ২১৪-২১১ ভোটে বিলটি এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়ার পর এখন প্রতিনিধি পরিষদে এর চূড়ান্ত ভোটের অপেক্ষা তৈরি হয়েছে।
‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামে পরিচিত এই আইনি উদ্যোগের লক্ষ্য মূলত রাশিয়ার জ্বালানি খাত ও দেশটির সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। একই সঙ্গে ইরানের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে সর্বশেষ ভোটটি সরাসরি ভারতকে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি এমন একটি আইনি কাঠামোকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ, যার অধীনে ভবিষ্যতে রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে যেতে পারে। ফলে ভারত এখন সম্ভাব্য শুল্কের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
এর আগে গত ৭ আগস্ট মার্কিন সিনেট ৮৬-১১ ভোটে বিলটি অনুমোদন করেছিল। সিনেটের অনুমোদনের পর বিলটি প্রতিনিধি পরিষদে যায়। সরকারি কংগ্রেশনাল রেকর্ডেও ওই ভোটের ফল নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে আইনটি এখন মার্কিন আইনপ্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের আওতায় রাশিয়ার জ্বালানি খাত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হবে। বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভারত ও চীনকে সম্ভাব্যভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ দুই দেশই রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের বড় ক্রেতা। তবে বিলটি আইনে পরিণত হলেও ১০০ শতাংশ শুল্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না; বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং তিনি তা প্রয়োগ করবেন কি না, সেটি পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়।
প্রতিনিধি পরিষদের সাম্প্রতিক প্রক্রিয়াগত ভোটে বিলটির পক্ষে ২১৪ এবং বিপক্ষে ২১১ ভোট পড়ে। এই ভোটের মধ্য দিয়ে বিলটি চূড়ান্ত বিবেচনার দিকে এগিয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে এবং পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে।
বিলটি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতা গ্রেগরি মিকসসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া এত বড় ক্ষমতা দেওয়া হলে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে বিলের সমর্থকদের অবস্থান হলো, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বড় ক্রেতাদের ওপর চাপ তৈরি করলে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশটির জ্বালানি আমদানির কাঠামোর কারণে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যসীমার ব্যবস্থার মধ্যে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে অপরিশোধিত তেল কিনেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া তেলের দামের সুবিধা ভারতের পরিশোধন ও জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ফলে রুশ জ্বালানি আমদানির ওপর মার্কিন চাপ বাড়লে ভারতের বাণিজ্য ও জ্বালানি নীতির ওপরও নতুন করে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ভারতের ওপর সম্ভাব্য ১০০ শতাংশ শুল্কের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বর্তমান পর্যায়ে বিলটি প্রতিনিধি পরিষদে এগিয়েছে এবং পরবর্তী ধাপ হলো চূড়ান্ত ভোট। এরপর আইনটি কার্যকর হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এমনকি আইন কার্যকর হলেও শুল্ক আরোপের বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তাই এই মুহূর্তে ভারতীয় পণ্যের ওপর নিশ্চিতভাবে ১০০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়েছে—এমনটি বলা সঠিক হবে না।
প্রস্তাবিত আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব এতে রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের জাহাজের গতিবিধি ও মালিকানা কাঠামোর ওপর নজর রাখছে। নতুন আইন কার্যকর হলে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাশিয়ার জন্যও প্রস্তাবিত আইনটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অর্থনীতিতে তেল ও গ্যাস রপ্তানি বড় ভূমিকা রাখে। ফলে রুশ জ্বালানির সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হলে মস্কোর জ্বালানি রপ্তানি বাজারে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে ভারত ও চীনের মতো বড় ক্রেতারা যদি মার্কিন বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক তেলবাজারে সরবরাহ, মূল্য এবং বাণিজ্যপথ নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের জন্য সম্ভাব্য শুল্কের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ভারত যদি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে, তাহলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও চাপ তৈরি হতে পারে। ভারতকে একই সঙ্গে সস্তা বা তুলনামূলক সুবিধাজনক জ্বালানি আমদানি এবং গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক—এই দুই দিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কনীতির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর একাধিক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইতোমধ্যে কার্যকর রয়েছে। নতুন মার্কিন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই চাপ রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতাদের ওপরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে একটি দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে তৃতীয় দেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তারও উদাহরণ হয়ে উঠছে।
সবশেষে, ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের আশঙ্কা এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত ভোট, পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত—সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পরই বিষয়টির বাস্তব রূপ স্পষ্ট হবে। তবে বিলটি মার্কিন কংগ্রেসে এগিয়ে যাওয়ায় ভারতসহ রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতাদের জন্য নতুন করে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সামনে এই বিলের চূড়ান্ত পরিণতি এবং ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভারতের ওপর সম্ভাব্য শুল্কের ঝুঁকি বাস্তবে কতটা বড় হয়ে ওঠে।