প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিউইয়র্কে শুরু হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এবারের অধিবেশনে যুদ্ধ, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বনেতাদের বক্তব্য ও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে সদস্যরাষ্ট্রগুলো।
এবারের অধিবেশনের একটি বিশেষ দিক হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। চলতি বছরের ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পালাক্রমিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এবার এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছে। তাঁর সভাপতিত্বে এমন এক সময়ে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে কঠিন করে তুলেছে।
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। এই প্রতিপাদ্যের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এবং পরিবর্তনশীল বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে জাতিসংঘের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের এই বৈশ্বিক ফোরামে প্রত্যেক দেশের সমান ভোটাধিকার রয়েছে। ফলে বড় শক্তি থেকে শুরু করে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশ—সব দেশের জন্য নিজেদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
এবারের আলোচনায় সবচেয়ে বড় জায়গা দখল করে থাকবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যুদ্ধ ও সংঘাত। ইরান, গাজা, ইউক্রেন, সুদান, কঙ্গো ও মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বনেতাদের বক্তব্য এবং কূটনৈতিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দীর্ঘস্থায়ী এসব সংঘাত শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে না, বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। জাতিসংঘের এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব কূটনীতিতে সংঘাত নিরসনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অধিবেশনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হতে পারে। একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা এগোতে পারে, তা নিয়েও নজর থাকবে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও বিশ্বনেতাদের আলোচনায় আসবে। যুদ্ধের সরাসরি ক্ষতির বাইরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্য ও জ্বালানির নিরাপত্তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবারের অধিবেশনে আরেকটি বড় আলোচনার বিষয়। প্রযুক্তিটির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং মানবাধিকারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এআই ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও এআই নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশকে থামানোর পরিবর্তে কীভাবে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল কাঠামোর মধ্যে রাখা যায়, সেটিই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতপার্থক্যও স্পষ্ট। প্রযুক্তি খাতের কিছু নেতা দ্রুতগতির এআই উন্নয়নের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ধরনের কিছু উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এআই নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরির প্রশ্নে বিভিন্ন দেশের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আসে, তা এবারের অধিবেশনে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনও সাধারণ পরিষদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে। ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে উচ্চপর্যায়ের জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এতে উন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্র এবং বড় জ্বালানি উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। জলবায়ু অর্থায়ন, জ্বালানি রূপান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের মতো বিষয় আলোচনায় থাকবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ, খরা ও অন্যান্য দুর্যোগের মাত্রা বাড়ছে। এর সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, পানি নিরাপত্তা এবং মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু ক্ষতির জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে নিউইয়র্কের আলোচনায় উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধানও গুরুত্ব পেতে পারে।
অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জাতিসংঘের নিজস্ব কার্যকারিতা ও সংস্কার। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি রয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব এবং ভেটো ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন দেশের মতপার্থক্য রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা এগোলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
জাতিসংঘের আর্থিক সংকটও এবারের অধিবেশনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তবতা। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বকেয়া চাঁদা এবং বিভিন্ন দেশের অর্থায়ন কমে যাওয়ার কারণে সংস্থাটির শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা ও অন্যান্য কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থের সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণত যুদ্ধ ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর, যাদের জন্য জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা হিসেবে কাজ করে।
এর পাশাপাশি জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টিও এবারের অধিবেশনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ শেষ হবে। ফলে নতুন মহাসচিব নির্বাচনকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নতুন নেতৃত্বের সামনে যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, এআই, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের মতো একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ থাকবে।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরাসরি অধিবেশনের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ হতে যাচ্ছে। তাঁর সফর ঘিরে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেরও আয়োজন রয়েছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা এবার নিউইয়র্কে সরাসরি উপস্থিত থাকছেন না। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের পরিবর্তে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্ব করবেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও এবারের অধিবেশনে সরাসরি উপস্থিত থাকার কথা নেই। তবে এসব দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শুরু হয়েছে। পরবর্তী দিনগুলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানসহ আরও অনেক বিশ্বনেতা বক্তব্য দেবেন। ফলে আগামী কয়েক দিন নিউইয়র্ক কার্যত বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে।
সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের সংকটগুলোর তালিকা যেমন দীর্ঘ, তেমনি সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিপর্যস্ত মানুষের নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জাতিসংঘের সংস্কার—সবগুলো বিষয় একই বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে থেকে এসব আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন বিশ্ব কূটনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।