আবরার ফাহাদ ও বিডিআর দিবস জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১০৭ বার
আবরার ফাহাদ ও বিডিআর দিবস জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী ও বিডিআর ম্যাসাকার দিবস জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই দুটি ঘটনার ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় এনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দিন দুটি এখন থেকে সরকারি ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শুধু দুটি দুঃখজনক ঘটনার স্মরণই নয়, বরং জাতি হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং ইতিহাসের শিক্ষা প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রতিজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত হলো।

সোমবার (৬ অক্টোবর) প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনের পর তাঁর দপ্তরের সরকারি ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে জানানো হয়, ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকাসহ দেশের সব শিল্পকলা একাডেমিতে একযোগে প্রদর্শিত হবে প্রামাণ্যচিত্র “You Failed to Kill Abrar Fahad”। এই প্রদর্শনীতে ঢাকায় উপস্থিত থাকবেন আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা। একইসঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় ক্যালেন্ডারে স্থায়ীভাবে আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী (৭ অক্টোবর) এবং বিডিআর ম্যাসাকার দিবস (২৫ ফেব্রুয়ারি) অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে দিন দুটি এখন থেকে প্রতি বছর বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে পালিত হবে।

আবরার ফাহাদ ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে তাঁকে শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বুয়েট ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর হাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে স্তম্ভিত করেছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা ও দমননীতির বিরুদ্ধে তখন দেশজুড়ে তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। রাত ৩টার দিকে করিডোর থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যার পর বুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধ হয় এবং শিক্ষার্থীরা দাবি করে “আবরার যেন শেষ আবরার হয়”।

প্রতি বছর আবরারের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে দিনটি পালন করে আসছেন। এবার সরকারিভাবে এ দিনটিকে জাতীয়ভাবে পালনের ঘোষণা দেওয়ায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এটি শুধু আমার ছেলের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাতির অবস্থান জানানোর প্রতীক।” তিনি আরও বলেন, “আমি চাই, এই দিনটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ন্যায়, মানবিকতা ও সাহসের বার্তা ছড়িয়ে দিক।”

অন্যদিকে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া বিডিআর বিদ্রোহের স্মৃতিও এই উদ্যোগে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। সে সময় বিদ্রোহী সৈন্যদের হাতে নিহত হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর ৫৭ জন কর্মকর্তা এবং বহু সাধারণ মানুষ। দিনটি বাংলাদেশ ইতিহাসে এক ভয়াবহ রক্তপাতের দিন হিসেবে চিহ্নিত। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেই ঘটনার দায় নির্ধারণ করা হলেও, এখনও জাতির হৃদয়ে রয়ে গেছে সেই বেদনাবহ স্মৃতি।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা এমন একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করছি যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিকতার মূল্যবোধকে তুলে ধরা হবে। আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী এবং বিডিআর ম্যাসাকার দিবসকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত এই দৃষ্টিভঙ্গিরই অংশ।”

জাতীয়ভাবে দিন দুটি পালনের অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে নাটক, প্রামাণ্যচিত্র, আলোচনা সভা ও বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর থেকেই ৭ অক্টোবর ও ২৫ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে আলোচনা ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে।

বিডিআর ম্যাসাকার দিবসের জাতীয় স্বীকৃতি সেনা পরিবারগুলোর কাছেও এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার থেকে একজন সদস্য বলেন, “আমরা চাই এই দিনটি শুধু শোক নয়, বরং দায়িত্ব ও শৃঙ্খলার মূল্যবোধ শেখানোর দিন হিসেবে পালিত হোক।”

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানিয়েছে, এই দুটি দিবসের পালন শুধু ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর স্মরণ নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে উৎসাহিত করাই মূল লক্ষ্য। আবরার ফাহাদের মতো তরুণদের স্মরণ করে রাষ্ট্র চায়—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধ চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক।

আবরারের মৃত্যুর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও প্রতিবাদের চেতনা আজও জীবন্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, “তুমি মরোনি আবরার, তুমি বেঁচে আছো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে।”

অন্যদিকে, বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও এই স্বীকৃতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণই নয়, বরং জাতির ইতিহাসে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞাকে দৃঢ় করবে।

জাতীয় সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে দিন দুটি যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এই দুই দিক—একটি তরুণের প্রতিবাদী মৃত্যু এবং একটি রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়—নতুনভাবে স্থান পাচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনায়। সরকার বিশ্বাস করছে, এভাবে স্মরণ ও শিক্ষা মিলেই গড়ে উঠবে ভবিষ্যতের মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত