প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নীরাজ পাণ্ডে পরিচালিত ও মনোজ বাজপেয়ি অভিনীত নতুন ছবি ‘ঘুষখোর পণ্ডিত’ ঘোষণার পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ছবির নাম ও বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে একাংশের অভিযোগ, এটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই ছবিটির বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রটি এখনো মুক্তি পায়নি, এমনকি ট্রেলার বা বিস্তারিত কাহিনিও প্রকাশ্যে আসেনি। তবুও ছবির নামকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে প্রবল আপত্তি। অভিযোগকারীদের দাবি, ‘ঘুষখোর পণ্ডিত’ নামটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের পেশাগত ও সামাজিক পরিচয়কে হেয় করেছে, যা মানহানিকর এবং আপত্তিকর।
এই মামলার আবেদনকারী আইনজীবী বিনীত জিন্দল আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন যে, ‘পণ্ডিত’ শব্দটি মূলত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে যুক্ত। সেই শব্দের সঙ্গে ‘ঘুষখোর’ শব্দটি যুক্ত করে একটি ছবির নামকরণ গোটা সম্প্রদায়ের প্রতি অপমানজনক ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এই নামের কারণে বহু ব্রাহ্মণ নিজেদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন।
আইনজীবী বিনীত জিন্দল আরও অভিযোগ করেন, ছবির কাহিনিতে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক বক্তব্য বা নেতিবাচক উপস্থাপনা থাকতে পারে, যা ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করবে। তাঁর আশঙ্কা, এই ধরনের সিনেমা সমাজে বিদ্বেষ, ভুল ধারণা ও বিভাজনকে উসকে দিতে পারে। সে কারণেই তিনি ছবিটির মুক্তির ওপর অবিলম্বে স্থগিতাদেশ জারির আবেদন জানিয়েছেন।
দিল্লি হাইকোর্টে দাখিল করা আবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সংবিধান সকল নাগরিকের মর্যাদা ও ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। কোনো শিল্পকর্ম যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বা অবহেলার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে হেয় করে, তাহলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করে। এই যুক্তির ভিত্তিতেই আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এদিকে ছবিটির নির্মাতা বা প্রযোজনা সংস্থার পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। পরিচালক নীরাজ পাণ্ডে কিংবা প্রধান অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। ফলে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হচ্ছে এবং বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিচ্ছে।
‘ঘুষখোর পণ্ডিত’ একটি ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার ছবি, যেখানে মনোজ বাজপেয়ি অভিনয় করছেন অজয় দীক্ষিত নামে এক দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ অফিসারের চরিত্রে। ছবির কাহিনি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিক অবক্ষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত বলে জানা গেছে। তবে ছবির নামের সঙ্গে চরিত্রের সরাসরি কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের যোগ আছে কি না, সে বিষয়ে নির্মাতারা এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
এই ছবিতে মনোজ বাজপেয়ি ছাড়াও অভিনয় করেছেন নুসরাত ভারুচা, সাকিব সালিম, অক্ষয় ওবেরয়, দিব্যা দত্ত, শ্রদ্ধা দাস ও জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা কিকু শরদা। শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী ও নীরাজ পাণ্ডের মতো পরিচিত নির্মাতার কারণে ছবিটি ঘোষণার শুরুতেই দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু বিতর্কের কারণে সেই আগ্রহ এখন বিভক্ত প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্ম ও পরিচয়সংক্রান্ত বিষয়ে দর্শকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। ফলে ছবির নাম বা বিষয়বস্তুর সামান্য ইঙ্গিতও বড় বিতর্কে রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, আরেক অংশের মত হলো—পুরো ছবি না দেখে কেবল নামের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া শিল্পীসত্তা ও সৃজনশীল স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
এ ধরনের বিতর্ক ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য নতুন নয়। অতীতেও বহু ছবি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে আদালতের মুখোমুখি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তন বা দৃশ্য সংশোধনের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুক্তি স্থগিত বা বিলম্বিত হয়েছে। ফলে ‘ঘুষখোর পণ্ডিত’-এর ভবিষ্যৎও এখন আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।
আইনি প্রক্রিয়া এগোতে থাকায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ২০২৬ সালে নির্ধারিত ছবিটির মুক্তি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রযোজনা সংশ্লিষ্টরা এখনো নিরব থাকলেও, আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ‘ঘুষখোর পণ্ডিত’ ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—সৃজনশীল স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতির সীমারেখা ঠিক কোথায় হওয়া উচিত। আদালতের রায় শুধু এই ছবির ভবিষ্যৎই নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন বিতর্কিত নাম ও বিষয়বস্তুর চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।