চাহিদার অতিরিক্ত আমদানি, তবুও ফলের দাম কমেনি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৫ বার
রমজানে আমদানি হলেও দাম বাড়ছে

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রমজান উপলক্ষে দেশের বাজারে ফলের চাহিদা বেড়েছে, সেই সঙ্গে বিদেশ থেকে রেকর্ড পরিমাণ আমদানিও হয়েছে। তবে বাজারে কমলা, আঙুর, আপেল ও মাল্টার দাম এখনও ঊর্ধ্বমুখী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম সাত মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে ৮৬ হাজার ৯৯১ মেট্রিক টন আপেল, ৪৪ হাজার ৪৫৬ মেট্রিক টন আঙুর, ৫০ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন মাল্টা এবং ৫৬ হাজার ৯৯৫ মেট্রিক টন কমলা খালাস করা হয়েছে। এসবের মোট মূল্য প্রায় দুই হাজার ২২ কোটি টাকা। এই বিশাল পরিমাণ আমদানির পরও কেন ফলের দাম কমছে না, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, গত সাড়ে সাত মাসে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন ফল আমদানি হয়েছে। রাজস্ব হিসেবে এ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার অর্জন হয়েছে। তিনি বলেন, আমদানিকৃত ফল দ্রুত খালাসের জন্য পরীক্ষা ও শুল্কায়ন বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে এবং দ্রুত এই ফল পেতে পারে।

এবারের আমদানির উৎস দেশগুলোতে রয়েছে মিশর ও চায়না থেকে মাল্টা, পোল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মালদোভা থেকে আপেল, ভারত থেকে আঙুর এবং চীন থেকে কমলা। তবু চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত আমদানির পরও দাম কমছে না। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, প্রতিটি কনটেইনার থেকে তারা ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা লোকসান করছেন। চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, রমজান মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ফলের দাম বেড়ে যায়। এছাড়া বাংলাদেশে ডলারের ঊর্ধ্বমুখী মূল্য ও শুল্কও দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে কাজ করছে।

বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে ২০ কেজির আপেলের কার্টন ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৬ হাজার টাকায়, সাড়ে আট কেজির কমলার কার্টন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়, ১০ কেজির আঙুরের কার্টন ২ হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় এবং ১৪ কেজির মাল্টা ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ফল আমদানিতে অত্যধিক শুল্ক আদায়ের ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম অনেক বেড়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মেসার্স পায়েল ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক প্রশান্ত সরকার বলেন, ৮০ টাকার ফলের ওপর ১১০ টাকা ডিউটি দিতে হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ১ হাজার ২৩৩ টিইইউএস বা ৬২৫টি বিশেষায়িত রেফার কনটেইনার রাখা আছে, যার অধিকাংশই আমদানিকৃত ফল বোঝাই। বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, এগুলোর দ্রুত খালাসের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া ইফতারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খেজুরও আমদানি করা হয়েছে ১ হাজার ৭৬ কোটি টাকার মূল্যের ৪৭ হাজার মেট্রিক টন। এ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ ৪৮১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। এর বাইরে চার ধরনের অন্যান্য আমদানি করা ফল থেকে আরও ২ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জিত হয়েছে।

বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ আমদানির ফলে দেশীয় ফলের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশীয় ফল বিদেশি ফলের তুলনায় পুষ্টিগুণে অনেক উন্নত। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, বিদেশি ফলের আগমন বেড়ে গেলে দেশীয় ফলের চাহিদা কমে যেতে পারে। ফলে দেশের কৃষক ও চাষিরা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

ফল আমদানির এই পরিস্থিতি এমন এক সময় এসেছে যখন দেশের বাজারে রমজান ও ইফতারের চাহিদা তুঙ্গে। ফলে দেশীয় ও বিদেশি ফলের সংমিশ্রণ বাজারে ভোক্তাদের কাছে সহজলভ্য হলেও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুল্ক, ডলারের মান, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা ও আমদানিকৃত ফলের গুণগত মান—বর্তমান ফলের দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়াচ্ছে।

এ অবস্থায় ব্যবসায়ী, কৃষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত খালাস ও শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি দেশীয় ফলের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র আমদানি বৃদ্ধি করলেই বাজারের দাম কমানো সম্ভব নয়। বরং বাজার ব্যবস্থাপনা, শুল্ক সংস্কার এবং আমদানিকৃত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করে দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।

বর্তমানে দেশের বাজারে ফলের দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও আমদানিকৃত ফল দ্রুত খালাস এবং বাজারজাত হলে ভোক্তাদের জন্য সুবিধা থাকবে। একই সঙ্গে, দেশীয় ফলের উৎপাদন ও বিপণন বৃদ্ধি করলে বাজারে স্বস্তি ফেরানো সম্ভব। তাই রমজান মাসে পর্যাপ্ত ফল সরবরাহ নিশ্চিত করা হলেও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত