প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের হালিশহরে সোমবার ভোরে ঘটেছে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণ, যা এখন পর্যন্ত পাঁচ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে গুরুতর দগ্ধ হয়ে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) মারা যান সাখাওয়াত হোসেন (৪৯), যিনি বিস্ফোরণে আহতদের মধ্যে শেষ কিস্তিতে মারা গেছেন। এর ফলে এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো পাঁচে।
বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানান, সাখাওয়াত হোসেনের শরীরের শতভাগই দগ্ধ হয়েছিল এবং তার চিকিৎসা সত্ত্বেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এর আগে এই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তার স্ত্রী নুরজাহান আক্তার রানী, ছেলে শাওন, ছোট ভাই সামির আহমেদ সুমন এবং ছোট ভাইয়ের স্ত্রী আশুরা আক্তার পাখি। নিহতদের পরিবারের সবাইকে একটি বাড়িতে ঘটে যাওয়া এই বিস্ফোরণ পুরো পরিবারকে শূন্য করেছে।
ডা. শাওন আরও জানান, বর্তমানে সাখাওয়াতের মেয়ে উম্মে আয়মান স্নিগ্ধা ৩৮ শতাংশ, ভাইয়ের মেয়ে আয়েশা ৪৫ শতাংশ, ভাইয়ের ছেলে ফারহান আহমেদ আনাস ৩০ শতাংশ এবং আরও এক ভাই শিপন ৮০ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক এবং চিকিৎসকরা রাতদিন চেষ্টা চালাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, সোমবার ভোরে হালিশহরের ওই বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণটির তীব্রতা এতটাই ছিল যে, পুরো পরিবার মুহূর্তের মধ্যে আগুনে ঘেরা হয়। ঘটনার সময় ঘরের সবাই ঘুমোচ্ছিলেন, তাই কেউ পালাতে পারেননি। বিস্ফোরণের পর স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন এবং আহতদের উদ্ধার করে বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
চট্টগ্রামের স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানায়, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকালে দগ্ধদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানায়, বিস্ফোরণের সময় বিস্তীর্ণ আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণে ঘরের অভ্যন্তরে থাকা সব ফার্নিচার ও সরঞ্জাম সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়ির কাঠামোয়ও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে গ্যাস লিকেজকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে বিস্তারিত তদন্ত শেষে চূড়ান্ত কারণ জানা যাবে। তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে বাসা-বাড়িতে নিয়মিত গ্যাস লাইন ও চুলার সংযোগ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য স্থানীয় প্রশাসন বাসিন্দাদের সতর্ক করে বলেছে, অবৈধ গ্যাস সংযোগ, পুরনো পাইপলাইন বা অনিরাপদ সংযোগগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন করতে হবে। এছাড়া গ্যাস ব্যবহার করার সময় পর্যাপ্ত জানালা ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
স্থানীয়রা জানান, এই দুর্ঘটনা পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমেছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, সাখাওয়াত হোসেনের পরিবার স্থানীয়ভাবে শান্তিপ্রিয় এবং দায়িত্বশীল ছিল। তাদের এমন হঠাৎ মৃত্যু পুরো সমাজকে স্তম্ভিত করেছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানান, গুরুতর দগ্ধদের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল। এই ধরনের দুর্ঘটনায় ত্বকের পুড়ে যাওয়া অংশের পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধারে মাস বা বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আহতদের জন্য বিশেষ বার্ন থেরাপি চালানো হচ্ছে এবং হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কেবল সরঞ্জাম না, সচেতনতা ও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরও জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য প্রাথমিকভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
এই দুর্ঘটনা একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ যে, গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা না নেওয়া হলে কী ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষত শহুরে এলাকায় যেখানে বাসাবাড়ির ঘনত্ব বেশি, সেখানে গ্যাস সংযোগ, চুলার অবস্থা এবং লিকেজ নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা আবশ্যক।
চট্টগ্রামের এই গ্যাস বিস্ফোরণ কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি পুরো শহরের জন্য সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত যান্ত্রিক পরীক্ষা, নিরাপদ সংযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রতিটি বাসিন্দার দায়িত্ব।
এভাবে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে পাঁচজনের মৃত্যু এবং আরও কয়েকজনের গুরুতর দগ্ধ হওয়ার ঘটনা চট্টগ্রামের সমাজে গভীর শোক ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও চিকিৎসকরা আহতদের যত্ন ও পুনর্বাসনে নিরলসভাবে কাজ করছেন।