প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঋণখেলাপির অভিযোগ ঘিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ ও চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। তাদের প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে করা পৃথক আপিলের শুনানি আগামীকাল আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই শুনানিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঋণখেলাপির অভিযোগে এই দুই প্রার্থীর প্রার্থিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতা চলছে। নির্বাচনের আগে হাইকোর্টের একাধিক আদেশে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে এবং সারোয়ার আলমগীর রিট আবেদনের মাধ্যমে তার প্রার্থিতা ফিরে পান। তবে পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে চ্যালেঞ্জ জানানো হলে বিষয়টি নতুন করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন একই আসনের জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-২ আসনে সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন জামায়াত প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। তাদের অভিযোগ, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীদের প্রকৃত ঋণখেলাপির অবস্থা সঠিকভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি এই দুটি লিভ টু আপিল গ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। আদালত জানায়, যদি এই দুই প্রার্থী নির্বাচনে সফল হন, তবে তাদের আসনের ফলাফল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গেজেট প্রকাশ স্থগিত থাকবে। এই নির্দেশনার পর থেকেই পুরো বিষয়টি বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
আগামীকালকের শুনানিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। কারণ, এই রায়ের ওপর নির্ভর করছে চট্টগ্রামের দুই গুরুত্বপূর্ণ আসনের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুই প্রার্থীই উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন বলে জানা গেছে, তবে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে এখনো তাদের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেটভুক্ত হয়নি।
আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন বলে তার পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে উপস্থাপন করবেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে তার মক্কেলের ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছে, যা আদালত বিবেচনায় নেবে বলে তারা আশাবাদী।
অন্যদিকে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের আইনজীবীরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীর ঋণখেলাপির প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করা বাধ্যতামূলক। তাদের দাবি, আসলাম চৌধুরীর ক্ষেত্রে ঋণ রিশিডিউলিংয়ের হার নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয় এবং এটি মনোনয়ন বৈধতার প্রশ্ন তৈরি করে।
আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। অন্যদিকে সারোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধেও কয়েকশ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই মামলার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে সারোয়ার আলমগীর প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৬২ হাজারের বেশি ভোট। একইভাবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরী এক লাখ ৪২ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকেন। তবে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে তাদের বিজয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার রায় শুধু দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে আরও বহু প্রার্থীর ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মামলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও অপেক্ষা বাড়ছে। সমর্থকদের মধ্যে যেমন আশা রয়েছে, তেমনি উদ্বেগও বিরাজ করছে। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে দুই আসনের রাজনৈতিক ভারসাম্য।
সব মিলিয়ে আগামীকালের আপিল শুনানি দেশের রাজনৈতিক ও আইনগত অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে দুই প্রার্থীর ভবিষ্যৎ এবং চট্টগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণে আসতে পারে নতুন মোড়।