প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শুরুতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা হয়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা পূর্বের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সূত্র অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রাজস্ব প্রবাহের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে বছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব আদায়ের ধীরগতির কারণে সংস্থাটি লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
এনবিআরের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। ধারাবাহিক এই ঘাটতির কারণে শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে লক্ষ্যমাত্রা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ এনবিআর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন লক্ষ্যমাত্রা চার লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা অর্জন করাও সহজ হবে না। তার মতে, অর্থবছরের বাকি সময়ে রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব আদায়ে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, তার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও বাহ্যিক কারণ রয়েছে। গত অর্থবছরেও এনবিআর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা কম আদায় করেছে। অর্থবছরের শুরুতে যেখানে চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে সংশোধনের পরও চার লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় সীমিত থাকলেও তা অর্জিত হয়নি।
গত অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আহরণ ছিল তিন লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই নিম্ন প্রবৃদ্ধি রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বল বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক চাপ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি এবং বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও জ্বালানি খাতে চাপও সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান অনিয়ম, কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা রাজস্ব আদায়ের প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি বড় করদাতাদের একটি অংশের কর পরিশোধে অনীহা এবং জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিও রাজস্ব প্রবাহে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) কম বাস্তবায়ন হার সরকারের ব্যয় কাঠামো ও রাজস্ব সংগ্রহে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করতে হবে, যা অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ এর আগে এক মাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উচ্চ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলছে, যা পরোক্ষভাবে রাজস্ব প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা আরও জানান, নতুন সরকারের অধীনে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা থাকলেও বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।