৪৯ বছরের ইতিহাস ভাঙার পথে সুপারস্টার বিজয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৮ বার
দক্ষিণী সুপারস্টার বিজয়

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের দক্ষিণী রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন। দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের আধিপত্যে আবদ্ধ রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা থালাপতি বিজয়। প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নির্বাচনী ময়দানে নেমেই চমক দেখিয়েছে তার দল ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ বা টিভিকে। প্রাথমিক ফলাফলে ১০০-র বেশি আসনে এগিয়ে থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জরিপ সংস্থা এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর হিসেবও পাল্টে দিয়েছেন তিনি।

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চলচ্চিত্র তারকাদের প্রভাব নতুন নয়। এমজি রামচন্দ্রন, জয়ললিতা কিংবা করুণানিধির মতো নেতাদের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই সিনেমা ও জনআবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু গত প্রায় পাঁচ দশকে নতুন কোনো চলচ্চিত্র তারকা নিজস্ব দল গড়ে সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। সেই বাস্তবতায় বিজয়ের উত্থান এখন শুধু একটি নির্বাচনী ঘটনা নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক ভোট গণনার প্রবণতা অনুযায়ী, ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় বিজয়ের দল ১০০ থেকে ১১৮ আসনের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত এই ফল বহাল থাকে, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে টিভিকে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম নির্বাচনে এমন ফলাফল ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিরল ঘটনা।

তামিলনাড়ুর ইতিহাসে ১৯৭৭ সাল ছিল একটি মোড় ঘোরানো বছর। সে সময় কিংবদন্তি অভিনেতা ও রাজনীতিক এমজি রামচন্দ্রন নিজের জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করে মুখ্যমন্ত্রী হন। তার পর থেকে বহু অভিনেতা রাজনীতিতে এসেছেন, কিন্তু কেউই সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি। জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রী হলেও তিনি এমজিআরের প্রতিষ্ঠিত এআইএডিএমকের উত্তরাধিকারী ছিলেন। ফলে বিজয়ের সম্ভাব্য সাফল্যকে অনেকেই ৪৯ বছরের রাজনৈতিক অভিশাপ ভাঙার সঙ্গে তুলনা করছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজয়ের উত্থান হঠাৎ করে হয়নি। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। ২০০৯ সালে তার ভক্তকুলকে সংগঠিত করে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ গঠন করা হয়। শুরুতে এটি একটি সামাজিক ও কল্যাণমূলক সংগঠন হিসেবে কাজ করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বুথভিত্তিক শক্তিশালী নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা সামাজিক সংকটে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষাসহায়তা দেওয়া এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিজয়ের সংগঠন গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতিই এখন নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখছে।

২০১১ সালে বিজয় প্রকাশ্যে এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তখন থেকেই অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভবিষ্যতে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আসবেন। তবে তিনি দীর্ঘ সময় সরাসরি রাজনৈতিক দল গঠন থেকে দূরে ছিলেন। এর পরিবর্তে ধীরে ধীরে নিজের জনভিত্তি আরও মজবুত করতে মনোযোগ দেন।

২০১৯ সালের পর থেকে বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে শুরু করে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, শিক্ষাব্যবস্থা, বেকারত্ব এবং দুর্নীতি নিয়ে তার বক্তব্য আলোচনায় আসে। চলচ্চিত্রের অডিও লঞ্চ কিংবা ভক্তদের অনুষ্ঠানে তিনি বারবার সামাজিক বৈষম্য, যুবসমাজের সংকট এবং সুশাসনের বিষয়গুলো সামনে আনেন।

তার জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। সেখানে বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কামের সমর্থিত প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় পান। তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, তার জনপ্রিয়তা কেবল সিনেমা হল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বাস্তব ভোটেও রূপ নিতে পারে।

অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ চালু করেন। দল ঘোষণার সময় তিনি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা সংস্কার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেন। তার ভাষণে বারবার উঠে আসে সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের কথা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ ভোটার ও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হতাশা থেকে অনেক ভোটার নতুন বিকল্প খুঁজছিলেন। সেই জায়গায় বিজয় নিজেকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

তবে সমালোচকরাও কম নন। অনেকেই বলছেন, জনপ্রিয় অভিনেতা হওয়া আর সফল প্রশাসক হওয়া এক বিষয় নয়। তামিলনাড়ুর মতো জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিজ্ঞতা ছাড়া ক্ষমতায় এলে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। যদিও বিজয়ের সমর্থকদের দাবি, পুরোনো রাজনীতির বাইরে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বই এখন সময়ের দাবি।

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও এই নির্বাচন গভীর আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। কারণ দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। বিজয়ের উত্থান ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এখনও চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়নি। তবে ভোট গণনার এই প্রবণতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একজন সুপারস্টার অভিনেতা, যিনি হয়তো খুব শিগগিরই রাজ্যের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত