নর্ড স্ট্রিম বিস্ফোরণ: অভিযুক্ত ইউক্রেনীয়, নেপথ্যে বড় রহস্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
নর্ড স্ট্রিম বিস্ফোরণ: অভিযুক্ত ইউক্রেনীয়, নেপথ্যে বড় রহস্য

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাল্টিক সাগরের অতল গহ্বরে ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যে শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, তা ছিল আধুনিক ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম চাঞ্চল্যকর ও রহস্যময় এক অধ্যায়। রাশিয়া থেকে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনে চালানো সেই নাশকতা কেবল অবকাঠামোরই ক্ষতি করেনি, বরং বিশ্বরাজনীতির সমীকরণকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা রহস্যের কুয়াশা ভেদ করে অবশেষে জার্মানির আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো একটি বড় সাফল্যের মুখ দেখেছে। দেশটির রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছেন, যাকে জার্মান সংবাদমাধ্যম ‘সেরহি কে.’ হিসেবে অভিহিত করছে। এই আইনি পদক্ষেপটি দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা একটি স্পর্শকাতর মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, যা এখন জার্মানি ও ইউক্রেনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক নতুন পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জার্মানির ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট জার্মান গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যক্তি নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনে চালানো নাশকতামূলক অভিযানের পরিকল্পনাকারী এবং সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সরকারি কৌঁসুলিরা তাকে অভিযুক্ত করেছেন বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা, শক্তিশালী বিস্ফোরক ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের মতো গুরুতর অপরাধে। তদন্তকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, নর্ড স্ট্রিম নেটওয়ার্কের চারটি পাইপলাইনের মধ্যে তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত করার পেছনে সাত সদস্যের একটি শক্তিশালী দল কাজ করেছিল, আর সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন এই সেরহি কে.। গত বছর ইতালিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ব্যাপক আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত নভেম্বর মাসে তাকে জার্মানির কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি জার্মানির কড়া নিরাপত্তায় বিচার প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হচ্ছেন।

নর্ড স্ট্রিম প্রকল্পের ইতিহাস এবং এর গুরুত্ব বিবেচনায় নিলে এই নাশকতার অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই গ্যাস পাইপলাইন রাশিয়ার জ্বালানি কূটনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল। প্রায় ১২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন বাল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে রাশিয়ার উপকূল থেকে জার্মানির উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মাধ্যমে জার্মানি এবং ইউরোপের বিশাল একটি অংশ তাদের শিল্পকারখানা এবং গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য সস্তা প্রাকৃতিক গ্যাস পেত। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর প্রাক্কালে জার্মানি নর্ড স্ট্রিম-২ প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয়। এর কয়েক মাস পরেই রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি গ্যাজপ্রম যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে নর্ড স্ট্রিম-১ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে পাইপলাইনগুলোতে রহস্যময় বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে হাজার হাজার টন মিথেন গ্যাস সাগরের পানিতে মিশে যায় এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসে।

এই বিস্ফোরণের পরপরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। শুরু থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব এবং ন্যাটো দেশগুলো রাশিয়ার ওপর সন্দেহের তীর ছুঁড়েছিল। রাশিয়ার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য মস্কোই নিজের পাইপলাইন ধ্বংস করেছে কি না, তা নিয়ে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা হয়েছিল। অন্যদিকে ক্রেমলিন এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পাল্টা আঙুল তোলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দিকে। তাদের দাবি ছিল, পশ্চিমারা রাশিয়ার জ্বালানি আধিপত্য ধ্বংস করতেই এই নাশকতার পথ বেছে নিয়েছে। তবে জার্মান তদন্ত কর্মকর্তাদের এই সাম্প্রতিক চার্জশিট সেই সব পুরনো অনুমান ও বিতর্কের ওপর এক নতুন মাত্রা যোগ করল। যদিও অভিযুক্ত সেরহি কে. নিজের ওপর আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তার আইনজীবী প্রতিষ্ঠান মেনাকার বার্লিন বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখছে। তবুও সরকারি আইনজীবীদের হাতে ঠিক কী ধরনের শক্তিশালী তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তা এখন দেখার বিষয়।

জার্মানির জন্য এই মামলার বিচার কাজ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। একদিকে, তারা ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামরিক এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। জার্মানির অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য ইউক্রেনের টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, জার্মানিতে অবস্থিত তাদের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার পেছনে ইউক্রেনীয় নাগরিকের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়া দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং জনমতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, ইউক্রেনের ভেতরে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে নর্ড স্ট্রিম ধ্বংসের ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে দেখার যে প্রবণতা রয়েছে, তা নিয়েও ইউরোপে অস্বস্তি বাড়ছে। অনেকের মতে, এই পাইপলাইন ছিল রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়নের প্রধান উৎস, তাই এটিকে অকেজো করে দেওয়া ইউক্রেনের জন্য এক ধরনের কৌশলগত বিজয় ছিল। কিন্তু আইনের শাসনে বিশ্বাসী জার্মান রাষ্ট্র এই ঘটনাকে কেবল নাশকতা হিসেবেই বিচার করতে চায়, যা দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

তদন্তের এই পর্যায়ে এসে এটি নিশ্চিত যে, ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। সাত সদস্যের ওই দলের বাকি সদস্যরা কোথায়, এবং তারা ঠিক কার নির্দেশে এই দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিল, তা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন সেই তথ্যের খোঁজে তৎপর রয়েছে। জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ডিডাব্লিউসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়টিকে কেবল একটি সাধারণ অপরাধমূলক মামলা হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি জটিল ধাঁধা হিসেবে দেখছে। মামলার বিচার প্রক্রিয়া যত এগোবে, তত নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি নিশ্চিত যে, এই নাশকতার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রাজনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিতর্কের অবসান ঘটবে না। জার্মান বিচার বিভাগ এখন এমন একটি অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে ন্যায়বিচারের শপথ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা—এই দুইয়ের সমন্বয় করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। এখন দেখার অপেক্ষা, এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং প্রকৃত নেপথ্য কারিগরদের পরিচয় জনসমক্ষে আসে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত