২০২৫-২৬ অর্থবছর: রাজস্ব ঘাটতি ৮০ হাজার কোটি টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
২০২৫-২৬ অর্থবছর: রাজস্ব ঘাটতি ৮০ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জিং এক বছর ছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। নানামুখী অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা ও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে দেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার করেছে। সদ্য সমাপ্ত এই অর্থবছরের সামগ্রিক রাজস্ব আহরণের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা যেমন উদ্বেগের, তেমনি আশার আলোও দেখাচ্ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এনবিআর প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা থেকে এনবিআর প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর এক প্রকার চাপ সৃষ্টি করেছে।

অর্থনীতিবিদদের অনেকের মধ্যেই শঙ্কা ছিল যে, চলমান অর্থনৈতিক মন্দার তীব্রতায় রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সেই চরম বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে এনবিআরের শেষ মুহূর্তের জোরালো প্রচেষ্টায়। এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, কর ফাঁকি রোধে কঠোর অভিযান, করদাতাদের ওপর নিবিড় নজরদারি, উন্নত পরিকল্পনা এবং কর কমপ্লায়েন্স জোরদারের মাধ্যমেই বড় ধরনের ধস থেকে রাজস্ব পরিস্থিতি রক্ষা করা গেছে। বছরের শেষ ভাগে, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে যে গতি সঞ্চারিত হয়েছিল, তা ছিল ঘাটতি কমানোর পেছনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই গত বুধবার নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭-এর রাজস্ব আহরণ কৌশল নির্ধারণে এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল তিতুমীর। বৈঠকে আগামী তিন বছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী মধ্যমেয়াদী রাজস্ব কৌশল প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন, আগামী তিন বছর রাজস্ব আহরণের সম্ভাব্য উৎস এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার খাতগুলো চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং দেশের অর্থনীতির গতিপথ পরিবর্তনের একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য।

নতুন এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে লিখিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। বুধবার পর্যন্ত ৪ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের কথা জানালেও, অর্থবছরের শেষ দিনের হিসাব সমন্বয়ের পর তা ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নতুন অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া প্রথম দিন থেকেই পুরোদমে শুরু হয়েছে। গত তিন মাসে টাস্কফোর্সগুলোর যে কার্যকর পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগ ইতিমধ্যেই তাদের রাজস্ব আহরণের খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। আয়কর বিভাগের পক্ষ থেকেও খুব দ্রুত কৌশলগত পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এই পরিস্থিতির ওপর ইতিবাচক আলোকপাত করেছেন। তিনি মনে করেন, নতুন বাজেটে যে বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে টার্নওভারভিত্তিক ভ্যাট ব্যবস্থা এবং খুচরা বিক্রেতাদের সরবরাহের ওপর ০.২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আদায়ের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা কর ফাঁকির প্রবণতা কমিয়ে রাজস্ব প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করবে।

বর্তমান অর্থবছরের এই ঘাটতি কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বরাদ্দের যে পরিকল্পনা থাকে, রাজস্ব আহরণ আশানুরূপ না হলে সেখানে টান পড়ে। তবে সরকার ও এনবিআর এখন যে পথে এগোচ্ছে, তাতে করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে কর প্রদানে আগ্রহী করে তোলা এবং কর কাঠামোর সরলীকরণই হবে আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত কর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে করদাতাদের মধ্যে আস্থা বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিশেষে বলা যায়, ৮০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি একটি বড় অংক হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং সক্ষমতা অনুযায়ী রাজস্ব সংগ্রহ করা এনবিআরের জন্য এক ধরনের সাফল্য। তবে এই ঘাটতি কমিয়ে আনা এবং লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছানোই হবে পরবর্তী অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অপরিহার্য, কারণ নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো উন্নয়নই হচ্ছে একটি দেশের প্রকৃত স্বাধীনতার পরিচয়। সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং সাধারণ করদাতাদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআর তাদের নতুন কৌশলের মাধ্যমে এই ঘাটতি কাটিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সাধারণ মানুষ ও অংশীজনরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত